আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি:
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জনপদ। উপজেলায় নানা ভাবে আবাদি জমি কমলেও বেড়েছে ফসল আবাদ করার পরিধি ও পরিমাণ। উচ্চ ফলন পেতে কৃষক বাড়িয়ে দিয়েছে বেশি পরিমাণ সারের ব্যবহার। এমন অবস্থায় সার প্রয়োগ ও চাহিদা নিয়ে কৃষক ও কৃষি বিভাগের হিসাবে মধ্যে বিস্তর তফাত পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিশেষ করে নন-ইউরিয়া সার নিয়ে মাঠ পর্যায় থেকে উঠে এসেছে এমন চিত্র। এই উপজেলায় রোপা আমন, বোরো ও আউষ ধানের চাষাবাদ ছাড়াও আলু, সরিষা কাঁচা মরিচ, শাক-সবজি চাষাবাদ করা হচ্ছে বাণিজ্যিক ভাবে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ মৎস্য চাষাবাদ। কৃষি বিভাগের হিসাবে ধান চাষাবাদে প্রতি বিঘার জন্য গ্রানুলার ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি'র প্রতিটি সার ১০ কেজি হারে এবং আলু চাষাবাদে জন্য ২০ কেজি হারে ওই চার প্রকারের সার প্রয়োগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের প্রয়োগবিধি হিসাব ধরে সরকারের কাছে চাহিদা দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কৃষক প্রয়োগ করেন দুই থেকে তিন গুণ বেশি পরিমাণ সার। এর মধ্যে আলু চাষাবাদে কৃষি বিভাগের নির্দেশনা মানেন না কোন কৃষক। কৃষকরা তখন প্রতি বিঘায় একশত কেজির নীচে সার প্রয়োগ করেন না। ফলে চাহিদার ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ৮০ কেজির মত। আবার প্রতি বিঘায় কাঁচা মরিচ ক্ষেতে (মরিচ গাছ টিকে রাখার জন্য) প্রতি সপ্তাহে সার প্রয়োগ করতে হয় প্রায় ৫০ কেজি করে। এতে ঘাটতির মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। এই চাহিদা বা ঘাটতি পুরণ করতে পারে না সরকারি ভাবে বরাদ্দ করা পরিমাণ সার। কৃষকের এই চাহিদা মানতে নারাজ কৃষি বিভাগ। ফলে এই ঘাটতি পুরণ করেন বড় বড় মজুতদার ব্যবসায়ীরা, এমনটাই দাবি করেন ডিলার ও খুচরা ডিলার ও সার ব্যবসয়ীরা। তারা এই সারগুলোকে "বাহিরের সার" নামে অবিহিত করেন। কিন্তু কৃষি বিভাগের দাবি বাংলাদেশে বাজারজাত করা সব সারই ভর্তুকির সার। বাহিরের সার বলতে কিছু নাই। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সরকারি সার ও বাহিরের সার বলে একটা বিভাজন বিদ্যমান রয়েছে। এই সার বেচাকেনার সময় কোন রশিদ দেওয়া হয় না আবার কাগজে কলমে প্রমানও রাখা হয় না। এসব অবৈধ সার মজুতদার প্রতিষ্ঠানগুলো ডিলার, খুচরা ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের নিকট বেশি দামে অবাধে বিক্রি করে আসছেন বলে দারি করেন উপজেলার ছোট বড় সব সার ব্যবসায়ীরা।
এটা শুধু আদমদীঘি উপজেলায় নয় দেশজুড়ে চলে আসছে বলেও দাবি এসব সার ব্যবসায়ীদের। এসব ব্যবসায়ীদের দাবি অপসিজনেও অবৈধ মজুতদারদের নিকট থেকে প্রতি বস্তা ডিএপি সার ১ হাজার ৪শত টাকার কমে কিনতে পাওয়া যায় না। একই ভাবে টিএসপি সার প্রতি বস্তা ৪ থেকে ৫শত টাকা ও দানাদার এমওপি সার দেড় থেকে ২শত টাকা বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয় কৃষকদের চাহিদা মেটাতে। এছাড়া সারের ব্যবসা চালু রাখা সম্ভব নয় বলে দাবি সার ডিলার খুচরা ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের। যে দামেই হোক তাদের নিয়মিত খদ্দের কৃষককে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার না দিতে পারলে আগের বকেয়া আদায় করা যায় না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে বাহিরের সার কেনাবেচা করতে হয়। ডিলারদের নিকট সরকারি বরাদ্দের সার শেষ হবার পর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে থাকেন অবৈধ মজুতদার সার ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।
অবৈধ ভাবে সার মজুতদার তথা কালোবাজারিদের বিপুল পরিমাণ সার পাওয়ার মাধ্যম বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, সারের প্রতিটি বাফার গুদাম এলাকায় রয়েছে সরকারি বরাদ্দের ডিও কেনাবেচার সিন্ডিকেট। বিশেষ করে ডিও কেনা সিন্ডিকেট বেশ শক্তিশালী, তারা কাউকে পরোয়া করেন না বলে জানিয়েছেন তাদের নিকট থেকে সার কেনাবেচা করা ডিলার, খুচরা ডিলার ও ভুক্তভোগী সার ব্যবসায়ীরা।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সুত্রের দাবি অনেক অসাধু ডিলার তার বরাদ্দের সার এসব কালোবাজারি মজুমদারের নিকট বিক্রি করে দেয় অপসিজনে। এরপর সিজন ও পিকসিজনে এই সারগুলো হয়ে যায় তুরুপের তাস।
এব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার রবিউল ইসলামের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের আগের পরিপত্র মোতাবেক মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন পরিপত্র বাস্তবায়ন হলে এই হিসাবের গড়মিল থাকবে না সব ঠিক হয়ে যাবে।