বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) জানিয়েছে, গতকাল রাত ১টায় কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ নম্বর ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে সেখান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় ১,৫০০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৬৪ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড বর্তমানে চরম চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৫,০০০ মেগাওয়াটের 'পিক ডিমান্ড' বা সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করছে। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রাত ১টায় ১৫,২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩,১৯৮ মেগাওয়াট।
গ্রীষ্মের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে বিদ্যুৎ সংকটের এই প্রায় ২,০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি—যা গত সোমবারের পরিস্থিতিরই পুনরাবৃত্তি—সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বিদ্যুৎ খাতের ক্রমাগত লড়াইকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্পোৎপাদন ও জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে, যার মধ্যে গ্রামীণ জনপদগুলো সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্ল্যাকআউটের শিকার হচ্ছে।
অঞ্চলভেদে লোডশেডিংয়ের মাত্রায় বড় ধরনের ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। গাজীপুরে লোডশেডিংয়ের হার ২৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও, সাভারে তা ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। সিলেটে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। অনেক এলাকায় দিনে কয়েকবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, আর গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের স্থায়িত্ব দাঁড়াচ্ছে সাত থেকে দশ ঘণ্টা পর্যন্ত।
বিপিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লারের 'এয়ার প্রি-হিটার' সংশ্লিষ্ট বিয়ারিংয়ের সমস্যার কারণে ইউনিট-১ বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, "এয়ার প্রি-হিটার বিয়ারিংয়ে কম্পন (ভাইব্রেশন) বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।"
বিপিডিবির একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, "আদানি আমাদের অবহিত করেছে যে ১ নম্বর ইউনিটটি পুনরায় চালু করতে অন্তত তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।"
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য বলছে, পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই আদানির সরবরাহ ১,১০৯ মেগাওয়াটে নেমে এসেছিল এবং রাত ২টার দিকে তা আরও কমে ৭৬৪ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়, কারণ বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি ইউনিট সচল রয়েছে।
গতকাল দিনের বেলা সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫,৪৫০ মেগাওয়াট প্রাক্কলন করা হলেও— উৎপাদন ছিল মাত্র ১৩,১১২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২,৩৩৮ মেগাওয়াটেরও বেশি। বিপিডিবি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, আদানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
চাপে এপ্রিল-মে মাসের উৎপাদন পরিকল্পনা
গ্রীষ্মের সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে, বিপিডিবি এর আগে এপ্রিল ও মে মাসে ১৭,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছিল। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী—৫,৬০০ মেগাওয়াট গ্যাস থেকে, ৬,০০০ মেগাওয়াট কয়লা থেকে, ১,৪৩৫ মেগাওয়াট আদানি পাওয়ার থেকে, ৩,৫০০ মেগাওয়াট তরল জ্বালানি এবং প্রায় ১,০০০ মেগাওয়াট এইচভিডিসি আমদানির মাধ্যমে আসার কথা ছিল।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত গ্যাসচালিত কেন্দ্রগুলো বর্তমানে গ্যাস সংকটের কারণে সক্ষমতার অনেক নিচে কাজ করছে। বিপিডিবির তথ্যানুসারে, ২১ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস সরবরাহ ছিল দৈনিক প্রায় ৮৯১.৬ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), যা দিয়ে ৪,৬০০ থেকে ৫,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
যদিও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ১১,০০০ মেগাওয়াট, বর্তমান সরবরাহ পরিস্থিতিতে প্রকৃত উৎপাদন কদাচিৎ ৫,০০০-৫,১০০ মেগাওয়াট ছাড়ানো সম্ভব হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত ১০০-১৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া গেলে উৎপাদন ৬,০০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব, তবে বর্তমান সংকটের মধ্যে গ্যাসের এই সরবরাহ পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত।
কয়লা সংকটে জর্জরিত কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো
কয়লা সংকটের কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনও চাপের মুখে রয়েছে। আগের পরিকল্পনায় কয়লা থেকে ৬,০০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষ্য থাকলেও—প্রকৃত উৎপাদন ৪,৫০০ থেকে ৪,৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গতকাল বিকেল ৪টায় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন ছিল ৪,৬০৫ মেগাওয়াট।
চলতি এপ্রিল মাসের ভ্যাপসা গরমে ১,৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এসএস পাওয়ার প্ল্যান্টের উৎপাদন কমে যাওয়া— লোডশেডিং সামাল দেওয়ার চেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কয়লা সংকটে কেন্দ্রটির একটি ইউনিট বন্ধ এবং অন্যটি মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করায়—এটি এখন সক্ষমতার অনেক নিচে চলছে।
বিপিডিবির সূত্রমতে, গ্রীষ্মের চাহিদা মেটাতে এসএস পাওয়ার একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হলেও কয়লা সংকটে এটি এখন সক্ষমতার চেয়ে কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কর্মকর্তারা জানান, আগামী রোববারের মধ্যে কয়লার নতুন চালান আসার কথা রয়েছে, ফলে আগামী সপ্তাহ থেকে এর সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
