ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে অনেকটা বৈরী পরিবেশে। এবার প্রতিটি নাগরিক একসঙ্গে দুটি ভোট দেবেন। তবে গণভোটে হ্যাঁ বা না জিতলে কী হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই অধিকাংশ ভোটারের; তাদের মধ্যে ধোঁয়াশা কাজ করছে। চারটি বিষয়ে কেউ একমত হলে ‘হ্যাঁ’ এবং একমত না হলে ‘না’ ভোট দেবেন। কোনো নাগরিক সব বিষয়ে একমত হতে না পারলে ভোটদানেই বিরত থাকতে পারেন বলে শঙ্কা করা হচ্ছে।
এবার গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সরকার। সরকারের সঙ্গে হ্যাঁ-এর পক্ষে জামায়েতে ইসলামী-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেকটা কৌশলী বিএনপি। তারা বিষয়টি নেতাকর্মীদের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আর গণভোটে ‘হ্যাঁ’র বিরোধিতা করছে জাতীয় পার্টি এবং কার্যক্রম নিষিধ আওয়ামী লীগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটে চারটি প্রশ্ন পড়ে ভোটকেন্দ্রেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ভোটারের সংখ্যা খুব কম। সরকার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরকেন্দ্রিক বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। ভোটার-সচেতনতার জন্য সরকার বিভিন্ন ভিডিও কন্টেট, ফটো কার্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড ও মোবাইলে খুদে বার্তা পাঠানোসহ গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে। বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানও গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচারণা করছে। সরকার যে ‘ম্যান্ডেট’ নিয়ে দেশ চালাচ্ছে, সেদিক বিবেচনায় তাদের অবস্থান ঠিক আছে।
ঢাকাসহ দেশের চারটি জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে কয়েকদিন ঘুরে দেখা গেছে, চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লায় ভোট নিয়ে আলোচনা থাকলেও গণভোটের বিষয়ে আলোচনা তেমন নেই। গণভোটে নিম্নআয়ের মানুষের আগ্রহ কম। স্থানীয়রা বলছেন, জামায়েতের নারীকর্মীরা এসে জাতীয় ভোটের পাশাপাশি গণভোট সম্পর্কে যেটুকু বলছেন ততটুকুই জানতে পারছেন তারা। জামায়াত কর্মীরা হাদি হত্যার বিচার, শেখ হাসিনার বিচারসহ কয়েকটি বিষয়ে বলছেন ভোটারদের।
মগবাজার মোড়ে গত শনিবার গণভোট নিয়ে কথা হয় কয়েকজন রিকশাচালক ও হকারের সঙ্গে। তারা বলছেন, ফেসবুক খুললেই হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বক্তব্য, গান ও নাটক সামনে আসছে। এ থেকে জেনেছি, হ্যাঁ’তে ভোট দিলে হাসিনা আর দেশে আসতে পারবে না; হাদির হত্যাকারীদের বিচার হবে।
রিকশাচালক আকবর ম-ল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি লেখাপড়া জানি না। টিপ-সই দিয়ে চলছি। এবার শুনছি ভোটে প্রশ্ন থাকবে, পড়ে ভোট দিতে হবে। এটা তো আমার পক্ষে সম্ভব না। স্ত্রীকে নিয়ে মা-ায় ভাড়া বাসায় থাকি। ওখানে চায়ের দোকানে বসলে বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলে। অনেকবার ভোট দিয়েছি প্রতীক দেখে। এবার কেমন ভোট হবে যে পড়তে হবে!’ তিনি বলেন, ‘মহিলারা বাসায় এসে বলে গেছেন, কোনো কিছু পড়তে হবে না। দাঁড়িপাল্লা মার্কা ও হ্যাঁ মার্কায় সিল দিলেই হবে। তাহলে গরিব মানুষ ভালো থাকবে। নির্বাচনের আগে সবাই এই কথাই বলে। তারপর আর কেউ খোঁজ নেয় না।’
সরেজমিনে সারা দেশের গণভোটের চিত্র
বগুড়া শাজাহানপুর উপজেলার মানুষের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকলেও গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে গণভোট বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে জানানো হলেও বাস্তবে উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম ও মহল্লা গুলোতে এ সংক্রান্ত কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ভোটাররা সংসদ নির্বাচনের দলীয় প্রতীকে ভোট দিতে অভ্যস্ত হলেও গণভোটের ব্যালট পেপার তাদের কাছে নতুন ও অপরিচিত। পর্যাপ্ত প্রচার ও দিকনির্দেশনার অভাবে ভোটারদের বড় একটি অংশ বুঝতেই পারছেন না হ্যাঁ বা না ভোট কীভাবে দিতে হবে। সচেতন মহলের আশঙ্কা, বিষয়গুলো পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা না হলে ভোটগ্রহণের দিন জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
শাজাহানপুর উপজেলার ইউনিয়নের চকচোপীনগর গ্ৰামে নারী ভোটার মজিনা বেওয়া বলেন, ‘হ্যাঁ-না ভোটের কথা আমি কিছুই বুঝি না। আমি দীর্ঘদিন ধরে দলীয় প্রতীকে ভোট দিয়ে আসছি। প্রতীক ছাড়া ভোট দেওয়া আমার জন্য কঠিন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাজাহানপুর উপজেলা অফিসার ইউএনও তাইফুর রহমান বলেন, গণভোট বিষয়ে প্রচার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাগেরহাট : বাগেরহাটের চারটি আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। দলীয় প্রতীকের ভোটের বিষয়ে সাধারণ মানুষের ধারণা থাকলেও গণভোটের বিষয়ে তাদের ধারণা অনেকটাই অস্পষ্ট। জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছে সংসদ সদস্য পদের ভোটের পাশাপাশি গণভোটের প্রচারণাও চালাচ্ছে। গণভোটে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করতে সরকারিভাবেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বাগেরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা রেজাউল করিম বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয় যখন আলোচনায় আসে তখন সাধারণ মানুষকে গণভোট দিলে কী হবে তা বুঝাই। গত ১৭ বছরে এদেশের মানুষ কেমন ছিল তা সবাই জানে-বোঝে। ওই ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে নতুন একটি বন্দোবস্ত সৃষ্টির জন্য এই গণভোট, এইটা সাধারণ মানুষকে বুঝাচ্ছি। গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে জোরেশোরে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি।’
বাগেরহাট জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খাদেম নিয়ামুল নাসির আলাপ বলেন, ‘বাগেরহাটের চারটি আসনে দলের মনোনীত প্রার্থীরা কাজ করছেন। নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি পথসভা, উঠান বৈঠক, আলোচনাসভা করছে। এসব সভায় গণভোট সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। গণভোটের বিষয়ে ভোটারদের সচেতন করছি। মানুষ একটা ধারণা পাচ্ছে।’
শেরপুর: এবারের গণভোট কীসের ভিত্তিতে হবে, তা জেলার ৫২টি ইউনিয়নে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে তুলে ধরতে হবে বলে মনে করেন ভোটাররা। শেরপুর সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নকলা ও নালিতাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, গণভোটের প্রচার-প্রচারণা নেই। শহরের মানুষ গণভোট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেলেও গ্রাম পর্যায়ে বিষয়টি অজানাই থেকে যাচ্ছে।
শেরপুর সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নের রাজু মিয়া বলেন, ‘আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, গণভোট কী এবং কীভাবে দিতে হবে, হ্যাঁ দিলে বা না ভোট দিলে কী হবে জানি না।’
শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের বালিজুড়ির খ্রিস্টান পাড়ার লবিন সাংমা বলেন, ‘এ বছর নাকি দুইটা ভোট দিতে হবে। গণভোটটা কেন দেব, দিলে কী হবে আর না দিলে কী হবে সেটাই তো বুঝি না।’
কুমিল্লা: অটোরিকশাচালক মোবারক মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে দেখি জাতীয় ভোটের লগে গণভোট হইব, কিন্তু ভোট দিলে কী হইব তা জানি না। ওই ভোট কেমনে দিমু তাও জানি না।’
জানা গেছে, কেবল নিম্নআয়ের মানুষ নন, শিক্ষিত ও পেশাজীবী অনেকের মধ্যেও গণভোটের বিষয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘শুনেছি গণভোট হবে, সংস্কারের বিষয়ে। কিন্তু বিষয়গুলো আমার কাছে পরিষ্কার না।’ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান বলেন, ‘জুলাইয়ের স্বপ্নকে বাস্তব করতে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া দরকার।’ কিন্তু গণভোটে কী প্রশ্ন থাকবে জিজ্ঞেস করলে তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
বেসরকারি চাকরিজীবী মহিউদ্দিন বলেন, গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে শুনেছেন। তবে ‘হ্যাঁ’ এর পক্ষে ভোট দিলে কী হবে তা তিনি জানেন না।

