আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা। অবসান হতে চলেছে দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালেই স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখবেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন স্থানীয় সময় সোয়া ৬টায় বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। তাকে বহনকারী বিমানটি সকাল ১০টায় সিলেটে অবতরণ করবে, এক ঘণ্টা যাত্রাবিরতির পর বেলা ১২টায় ঢাকায় নামবে। দলের কাণ্ডারিকে বরণ করতে বর্ণাঢ্য প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। ফেরার দিনটিকে অবিস্মরণীয় করে রাখতে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশের আয়োজন করছে দলটি। রাজধানীর তিনশ’ ফিট সড়কে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বিমানবন্দরে নেমে সংবর্ধনাস্থলে আসবেন তারেক রহমান। সেখানে সারা দেশ থেকে আসা নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। সংবর্ধনাস্থল থেকে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে যাবেন। সেখানে মায়ের শয্যাপাশে কিছুসময় কাটিয়ে গুলশানের বাসভবনে ফিরবেন তারেক রহমান। এদিকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে স্বাগত জানাতে ইতিমধ্যে ঢাকামুখী জনস্রোত শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন থেকে আসা দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী ঢাকায় অবস্থান করছেন। এমনকি বিদেশে অবস্থান করা নেতাকর্মীরা ঢাকায় আসছেন তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে।
বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা উপলক্ষে যে উদ্দীপনা ও প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে, তাতে উপস্থিতির দিক দিয়ে অতীতের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে যাবে এই গণসংবর্ধনা। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তার দেশে ফেরা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। সে কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই সংবর্ধনায় অংশ নেবেন বলে তারা আশা করছেন। সূত্র জানায়, বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে রাজধানীর কুড়িলের ৩০০ ফিট সড়ক এলাকায় গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছে দলটি। সর্বোচ্চ জনসমাগম নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুরো আয়োজন সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ রাখতে কাজ করছেন নেতাকর্মীরা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে দলের পাশাপাশি সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি পেয়েছে দলটি। মঞ্চ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দফায় দফায় দলটির শীর্ষ নেতারা অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমান দেশে নামার পর বিমানবন্দর থেকে গণসংবর্ধনা স্থান এবং গুলশান পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে খেয়াল রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দলের শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানাবেন। এ ছাড়া ঘোষিত সম্ভাব্য প্রার্থী, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থেকে এদিনের কর্মসূচি সফল করবেন। সূত্রটি আরও জানায়, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তারেক রহমানের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার জন্য আবেদন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। দলীয়ভাবেও নেতাকর্মীরাও তার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করবে বলেও জানা গেছে।
বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। তার সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামকে। নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ নিয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও বৈঠক করছে। বিমানবন্দর থেকে গুলশানের বাসা পর্যন্ত তারেক রহমানকে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা দিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। দেশে ফেরার পর তারেক রহমান যাতায়াতের সময় পাবেন পুলিশি পাহারাসহ বিশেষ নিরাপত্তা। এছাড়াও তার বাসভবন এবং অফিসেও থাকবে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা। অন্যদিকে নিরাপত্তাজনিত হুমকির কথা উল্লেখ করে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরার আগে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) নিরাপত্তার আবেদন করেছে দলটি। তবে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। গতকাল দুপুরে বিএনপি’র গুলশান কার্যালয়ে নিরাপত্তা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়।
অন্যদিকে দেশে ফেরার পর মা খালেদা জিয়ার বাসভবন ফিরোজার পাশেই গুলশান এভিনিউ’র ১৯৬ নম্বর বাড়িতে ওঠার কথা রয়েছে তারেক রহমানের। তবে সংস্কার কাজ শেষ না হলে মায়ের বাসভবন ফিরোজায়ও তার জন্য প্রস্তুত করা আছে ৩টি রুম বলে জানা গেছে।
বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন মানবজমিনকে বলেন, দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন ও সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত আবেগে শুধু নেতাকে দেখার জন্য আসবে দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার জন্য।
স্থায়ী কমিটির বৈঠক: তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে সামনে রেখে গত সোমবার বৈঠক করেছে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তকে ঐতিহাসিক করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়। এ ছাড়া বৈঠকে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে নেতারা আলোচনা করেন। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ তারেক রহমানকে ঢাকা থেকে নির্বাচন করতে অনুরোধ জানান। বৈঠক সূত্র জানায়, সমমনা দল ও জোটের আসন সমঝোতাসহ নিজ দলের বিতর্কিত আর দুর্বল প্রার্থীদের নিয়েও সভায় আলোচনা করেন। সেখানে মিত্র দলগুলোর আসন সমঝোতা অনেকটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দলের নেতারা জানান। আর সারা দেশে বিতর্কিত আর দুর্বল প্রার্থীদের বিষয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন তারা।
বৈঠকে তারেক রহমানের সংবর্ধনার মঞ্চে কারা উপস্থিত থাকবেন সেটা নিয়েও আলোচনা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ বিএনপি এবং দলের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সুপার টু নেতারা সেখানে থাকবেন। এর বাইরে জুলাইযোদ্ধার নিহত পরিবার ও আহত পরিবারের একজন করে সদস্য থাকবেন।