
মোঃ নাজিরুল ইসলামঃ
পরপর দূর্ঘটনায় একাধিক পুত্র সন্তান হারানো অত্যন্ত সাদা মনের অধিকারী পিতা আব্দুল জলিল (৬০)। আব্দুল জলিল পেশায় একজন কৃষক। এখন সেই বৃদ্ধ হতভাগা পিতা আব্দুল জলিল দম্পতির বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন সদ্য প্রয়াত পুত্র রেজাউল করিম জিহাদীর রেখে যাওয়া মাত্র ৪ বছরের পুত্র অবুঝ শিশু নাহিদ হাসান। এমন হৃদয় স্পর্শ কাতর করা ঘটনা ঘটেছে বগুড়ার শাজাহানপুরের মানিকদিপা ফকির পাড়া গ্রামের ভূক্তভোগী এক নরম মনের অধিকারী বৃদ্ধ আব্দুল জলিল দম্পতির জীবনে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল জলিল দাম্পত্য জীবনে ৪ সন্তানের জনক। বড় ছেলে মজনু মিয়া ভরসা। মজনু প্রায় ২০ বছর আগে মাত্র ১৩ কিংবা ১৪ বছর বয়সে এক দূর্ঘটনাজনিত কারণে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান পরপারে। ছাত্র জীবনে মজনু মিয়াও ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী।
বড় ছেলে মজনু মৃত্যুর পর আব্দুল জলিলের ঘরে ছিল মেয়ে জয়নাব খাতুন ও মেজো ছেলে মোঃ রেজাউল করিম। মেয়ে জয়নাবকে বিবাহ দিয়ে ছেলে রেজাউল করিম জিহাদীকে নিয়ে বৃদ্ধ আব্দুল জলিল কৃষি কাজ করে কিছুটা সুখে ও দূখে বয়ে বেড়ান সংসার জীবন। ওদিকে মেয়ে জয়নাব বেশ ভালো ভাবেই কাটাচ্ছেন স্বামীর সাথে সংসার জীবন। হতভাগা পিতা আব্দুল জলিল কৃষি কাজের পাশাপাশি রেজাউল করিমকে মাদ্রাসা লাইনে পড়াশোনা করাতে থাকেন। এতে অনেকটাই আল্লাহ ভীতু হয়ে রেজাউল করিম ইসলাম শিক্ষা অর্জন করে নিজেকে ইসলামী পথ অনুসরণ করে আলোকিত জীবন গঠন করতে শুরু করেন। এর পর থেকেই রেজাউল করিম বিভিন্ন ইসলামী জালসায় কোরআনের আলোকে ওয়াজ নসিয়ত করতে থাকেন। এমনকি নিজ এলাকাবাসী ও সকল পরিচিতজনকেও ইসলামী জীবন ব্যবস্থা হৃদয়ে ধারণ করে চলার তাগিদ দিয়ে যেতেন সব সময়। এতে করে সমাজে রেজাউল করিম সূধীজনের কাছে জিহাদী নামে পরিচিত লাভ করেন। এমতাবস্থায় আব্দুল জলিল দম্পতির ঘর আলোকিত করে জন্ম নেয় আরও একটি পুত্র সন্তান মোঃ রায়হান।
অপরদিকে আব্দুল জলিলের একমাত্র নিঃসন্তান শ্যালক মোতাহার আলী। শ্যালক মোতাহার আলী দীর্ঘ সংসার জীবন অতিবাহিত করলেও কোনো সন্তানাদি হয়নি। আপন ছোট ভাই যখন নিঃসন্তান, তখন ভূমিষ্ঠ হওয়া মাত্র ১৭ দিনের শিশু রায়হানের মায়া ত্যাগ করে ছোট ভাইয়ের কাছে নিঃশর্তে রায়হানকে দান করে দেন আব্দুল জলিলের ধৈর্য্যশীলা স্ত্রী। এর পর থেকে সংসারে উপার্জনক্ষম একমাত্র মেজো ছেলে মোঃ রেজাউল করিম জিহাদীকে নিয়েই চলছিল বৃদ্ধ আব্দুল জলিল দম্পতির জীবন তরী। রায়হানের জন্মগত সূত্রে পিতা আব্দুল জলিল হলেও পালিত সূত্রে এখন তার পিতা মোতাহার আলী। আপন জন্মদাতা পিতা আব্দুল জলিল বর্তমানে রায়হানের কাছে ফুফা বলে পরিচিত। রায়হান শিশুকাল থেকেই নয়মাইল বামুনিয়া কামারপাড়া গাঁয়ে তার মামাকেই পিতৃ পরিচয় দিয়ে বেড়ে উঠেছে। রায়হানের বয়স এখন প্রায় ২০ বছর।
এদিকে মাত্র ৩০ বছর বয়সে আব্দুল জলিলের মেজো ছেলে মাওলানা মোঃ রেজাউল করিম জিহাদী গতকাল ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার সকালে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুনিয়াবি সফর শেষ করে এখন কবরে শায়িত। জিহাদীর দাম্পত্য জীবনে রেখে গেছেন স্ত্রী ও একমাত্র অবুঝ শিশু নাহিদ হাসান (৪)। জিহাদীর রেখে যাওয়া সেই অবুঝ শিশু নাহিদ হাসানই এখন বৃদ্ধ মা বাবার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
সদ্য প্রয়াত রেজাউল করিম জিহাদী কর্মজীবনের পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শাজাহানপুর উপজেলা শাখার রুকন সদস্য, আড়িয়া ইউনিয়ন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি, সাজাপুর পূর্ব দক্ষিণ পাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম ও
মানিকদিপা ফকিরপাড়া জামে মসজিদে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ইমামতি হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।
বৃদ্ধ আব্দুল জলিল দম্পতি পর পর দুটি পুত্র সন্তানকে হারিয়ে অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। শোকের মাতম বইছে তার পুরো পরিবার জুড়ে। অত্যন্ত দূঃখকষ্টে ভরপুর বৃদ্ধ এই দম্পতির সংসার জীবনের শেষ ভরসা এখন একমাত্র নাতি শিশু নাহিদ হাসান।




