
কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার পরমতলা ইদ্রিসিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক আব্দুল হান্নান (৪৮) এর বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের যৌন হেনস্তা, প্রাইভেট বাণিজ্য, ফ্যাসিবাদী সরকারের অনুগামী এবং পরীক্ষায় চরম বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পদত্যাগের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী নানান কর্মসূচি পালন করে আসছে শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার ( ২৪ সেপ্টেম্বর ) ক্লাস বর্জন করে কিছুক্ষণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন মু. আব্দুল হান্নান ২০১৫ সালে মাদ্রাসায় যোগদান করার পর থেকে নানান প্রকার অনিয়মের সাথে জড়িত। প্রাইভেট বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক হলেও তার আগ্রহ ছিল গণিত বিষয়ের উপর। শিক্ষার্থীদের নানান ভাবে প্রাইভেটে বাধ্য করে তাদের অনৈতিকতার ইঙ্গিত দিতেন বলে জানা গেছে। শুধু প্রাইভেটে নয়, ক্লাসেও মেয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে বসে তাদের গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
দশম শ্রেণির ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী বলেন প্রাইভেট শেষে স্যার আমাকে খারাপ ভাবে স্পর্শ করার চেষ্টা করে। তখন আমার এক বান্ধবী দেখে আমাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
নবম শ্রেণীর কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন আমরা স্যারের কথায় স্যারের বাসায় জন্মদিন অনুষ্ঠান পালন করতে যাই।কেক কাতার শেষ পর্যায় আমরা যখন একে অপরের মুখে কেক লাগিয়ে দিচ্ছিলাম তখন স্যার আমাদের মুখে কেক লাগিয়ে দেয়। সর্বশেষ হাতমুখ ধোয়ার জন্য আমরা যখন ওয়াশরুমে যাই তখন আমরা ওয়াশ রুমে থাকা অবস্থায় স্যারও ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। আমরা সবাই চলে আসলে আমাদের মধ্যে একজন সেখানে থেকে যায়। স্যার তার সঙ্গে খারাপ কিছু করার চেষ্টা করলে সে চিৎকার করে তখন আমরা তাকে নিয়ে চলে আসি।
সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন স্যারের চাপে পরে আমরা প্রাইভেট পড়তে যাই। একদিন স্যার আমার হাত ধরেন। আমি দূরে চলে যাই। তারপর স্যার আমার হাত কাছে এনে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করেন। এই শিক্ষার্থী আরও অভিযোগ করেন স্যার পরীক্ষার হলে তার পাশে এসে বসেন, তার হাত ধারে লিখে দেন তারপর আস্তে আস্তে তার বুকে হাত দেন।
একই ক্লাসের আরেক শিক্ষার্থী বলেছেন স্যার আমাদেরকে প্রাইভেট পড়ার জন্য চাপ দেন আমরা রাজি না হওয়ায় তিনি আমাদের বেত্রাঘাত করেন এই শিক্ষার্থী আরো বলেন ক্লাসে আমি সূত্র না পাড়ায় স্যার কে যখন বলি সূত্রটি বুঝিয়ে দেন তখন স্যার সূত্রটি বুঝাতে শুরু করেন এবং একটু পরে স্যার আমার পিঠে হাত দেয় তারপর আস্তে আস্তে আমার বুকে হাত দিয়ে ফেলে। এখন আমি হান্নান স্যারের পদত্যাগ চাই উনার মত শিক্ষককে আমি আর দেখতে চাই না।
ষষ্ঠ শ্রেণির এক মেয়ে শিক্ষার্থী বলেন স্যার ক্লাসে এসে বিভিন্ন মেসে শিক্ষার্থীদের গায়ে টাচ করেন। একাধিক শিক্ষার্থীর জবানবন্দিতে এই কথার সত্যতা মিলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলিম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন আমার এক বান্ধবীকে স্যার রাত কাটানোর জন্য অফার দিয়েছে। আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় স্যার এর স্ত্রী আমার বোনকে নানান অপবাদ দিচ্ছে।
ফয়সাল ইকবাল নামে আলিম প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন গত বছরের আগস্টে আমি শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্ত্বেও মাদ্রাসায় পিটিতে অংশগ্রহণ করি এমন অবস্থায় শপথ বাক্য পাঠ করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি তখন আমি চুপ থাকি এর ফলে স্যার আমাকে সামনে ডেকে নিয়ে নানান ভাবে অপমান করেন। তিনি রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে আমাকে নানা হুমকি দেন। বিষয়টি নিয়ে আমার এক শিক্ষক প্রতিবাদ করলে ওই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন এবং ওই শিক্ষকের সাথে রাজনৈতিক প্রভাব খাটান।
একই ক্লাসের আকাশ নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন ফেসবুকে একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে স্যার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মাধ্যমে আমাদের নানান হুমকি দেন এবং ওই ছাত্রলীগ নেতা মাদ্রাসার অফিসে আমাদের গায়ে হাত তুলতে আসেন তখন আমাদের কয়েকজন শিক্ষক বাঁধা দিলে আমাদের গায়ে হাত তুলতে পারেননি।
এছাড়াও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন আমরা মাদ্রাসায় দরখাস্ত জমা দিলে উনি আমাদের নানান ভাবে হেনস্তা করেন এবং ভয় দেখান। তাছাড়া হান্নান স্যার এর স্ত্রী অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে সাদা কাগজে সাক্ষর নেন। অভিবাদকদের বুঝাতে থাকেন। এক শিক্ষার্থীর বাড়ি থেকে স্বাক্ষর আনতে গিয়ে তাদের হাতে আটক হলে মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষার্থীদের খবর দেওয়া হয়। তখন শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের জবাবে কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। অভিযুক্ত মু. হান্নান বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যক্তি সহ অনেক অভিবাভাকদের টাকা দিয়ে হাত করার চেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাবে।
অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বিষয়টির দ্রুত বিচার চাওয়া হয়েছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থীরাও ওনার পদত্যাগসহ কঠোর শাস্তি চেয়েছেন।
এ বিষয়ে মু. আব্দুল হান্নান স্যার এর কাছে জানতে চাইলে ওনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তিনি সকল শিক্ষকের সামনে দোষ স্বীকার করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের নিকট ক্ষমা চেয়েছেন। প্রাথমিক ক্ষমা না পেয়ে এখন নতুন নাটক করছেন।
এ বিষয়ে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ মাওলানা নৌশাদ আলম বলেন যেহেতু শিক্ষার্থীরা ওনার পদত্যাগ চায় তাই আমরা কয়েকবার শূরা বসেও বিষয়টির সমাধান করতে পারিনি। পরে ভাইস প্রিন্সিপাল হুজুর সহ শিক্ষার্থীদের নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিক্ষা অফিসারের দারস্থ হই। ওনারা তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা চিঠি পেয়েছি।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ( ইউএনও) সিফাত উদ্দিন বলেন তদন্ত চলছে। রিপোর্ট পেলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাজহারুল ইসলাম নাঈম
কুমিল্লা