গত বছর জুনের সংঘাতে পর মাত্র আট মাসের ব্যবধানে ইরান আবারও পশ্চিমা শক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে। যদিও সেবারের হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ধ্বংস। আর এবার লক্ষ্য দেশটির ৪৭ বছরের ইসলামি শাসনতন্ত্রের অবসান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ অন্তত ৪০ শীর্ষ কর্মকর্তার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
ইরানে শনিবার থেকে শুরু হওয়া বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৫৫ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল ইরানের রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে দেশটির বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, কুয়েতের নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘ভুলবশত’ যুদ্ধবিমানগুলো ভূপাতিত করেছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে আবারও আলোচনা শুরুর জন্য তেহরান প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্পের এমন দাবিকে সরাসরি নাকচ করেছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি। গতকাল তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান কোনো আলোচনায় বসবে না। এক এক্স পোস্টে লারিজানি ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক মন্তব্যেরও জবাব দেন। তিনি ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, শূন্য বিভ্রম দিয়ে তিনি অঞ্চলটিকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। লারিজানির ভাষায়, এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের আরও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নিজের ভ্রান্ত ধারণা দিয়ে তিনি আমেরিকা ফার্স্ট স্লোগানকে ইসরায়েল ফার্স্ট রূপান্তর করেছেন এবং ইসরায়েলের ক্ষমতার লালসার জন্য নিজ সেনাদের উৎসর্গ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নতুন নতুন মিথ্যার মাধ্যমে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারকে তিনি এর মূল্য দিতে বাধ্য করছেন। এর আগে ট্রাম্প জানান, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব তার প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে ইচ্ছুক এবং তিনি সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তারা (ইরানের নতুন নেতৃত্ব) কথা বলতে চায় এবং আমি তাতে রাজি হয়েছি। সুতরাং, আমি তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে বড় ধরনের সামরিক হামলা চালালেও ‘সবচেয়ে বড় ঢেউ’ এখনো আসেনি। মার্কিন বাহিনী ইরানকে ‘ভালোভাবেই আঘাত করছে’। তবে আরও বড় পদক্ষেপ সামনে রয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার সকালে সিএনএনকে দেওয়া প্রায় ৯ মিনিটের এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিবৃতির বরাত দিয়ে ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজ এজেন্সি বলেছে, ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর অপরাধী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং তাদের বিমান বাহিনীর প্রধান কার্যালয়কে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ওই হামলায় ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি খাইবার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহু ও বিমান বাহিনীর প্রধান কার্যালয়ে এ হামলার বিষয়ে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য জানায়নি আইআরজিসি।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকরা বলেছেন, সোমবার জেরুজালেমের আকাশে একের পর এক নতুন বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর আগে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইরান থেকে ছোড়া নতুন ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানায়। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সক্রিয় রয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানি হামলার মুখে কুয়েতের একটি কমব্যাট মিশনে থাকা অবস্থায় তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান এ দুর্ঘটনার শিকার হয়। সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কুয়েতের ওপর ইরানের বিমান বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন দিয়ে হামলা চালানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, কুয়েতি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে যুদ্ধবিমানগুলো ভুলবশত ভূপাতিত হয়েছে। বিধ্বস্ত হওয়া বিমানগুলোর ছয়জন ক্রু সদস্যই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন।
তবে কাতারের জনগণের ওপর ইরানের ‘ন্যক্কারজনক’ হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দোহা। সোমবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মজিদ আল-আনসারি বলেছেন, এ হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার অধিকার কাতারের রয়েছে এবং ইরানকে এর জন্য ‘চড়া মূল্য দিতে হবে’। সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কাতার বর্তমানে ইরানের সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখছে না। এখন তাদের মূল মনোযোগ দেশের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা। কাতারের এ মুখপাত্র জানান, তার দেশ ইতিমধ্যে ১০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং অসংখ্য ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। তবে যুদ্ধ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো বলছে, কাতার লক্ষ্য করে অন্তত ৬৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। আল-আনসারির অভিযোগ, ইরানের এ হামলায় সামরিক নিশানার পাশাপাশি বেসামরিক এবং বাণিজ্যিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সৌদি আরবের রাস তানুয়া তেল শোধনাগারে সোমবার ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো ওই শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এসপিএতে এক সামরিক মুখপাত্র এ ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক সরকারি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, ড্রোন হামলার কারণে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। মূলত সাবধানতা অবলম্বন করতেই শোধনাগারটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলার পর ওই এলাকা থেকে ঘন কালো ধোঁয়া উড়ছে। সামরিক বাহিনী ড্রোনগুলো সফলভাবে প্রতিহত করলেও এর ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে আগুন লাগার সম্ভাবনা থাকে এবং ভূমিতে থাকা ব্যক্তিদের আহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।