এই নির্বাচনে মূল লড়াই হচ্ছে মধ্য-ডানপন্থি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং কট্টর ডানপন্থি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোটের মধ্যে। একসময় বিএনপি ও জামায়াত একে-অপরের রাজনৈতিক মিত্র ছিল এবং একসঙ্গে নির্বাচন করত। এমনকি ২০০১-২০০৬ মেয়াদের বিএনপি সরকারে জামায়াতের নেতারা মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
মূলত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি অভিন্ন বৈরিতা দীর্ঘদিন বিএনপি ও জামায়াতকে একত্রে রেখেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে রাজনীতির মাঠ থেকে সরে যাওয়ার পর সেই বন্ধন আর নেই। গত এক বছরে সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচন কবে হবে— এ ধরনের নানা ইস্যুতে দুই দলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। আর নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে এবং ক্ষমতার লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, বিএনপি ও জামায়াতের বিচ্ছেদ ততই অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
আসন্ন এই নির্বাচনে সংসদের ৩০০টি আসন নিয়ে লড়াই হবে। শুরু থেকে অবশ্য বিএনপিই এগিয়ে ছিল। কয়েক দশক ধরে দলটির সমর্থনভিত্তি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যেই ঘোরাফেরা করেছে। তবে সমস্যা ছিল সবসময়ই। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দমন-পীড়নে বিএনপি দুর্বল, হতাশ ও বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। দলীয় চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তখন কারাগারে এবং অসুস্থ ছিলেন। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছিলেন যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে। এতে করে তিনি মাঠের নেতা-কর্মীদের থেকে দূরে ও বিচ্ছিন্ন বলে মনে হচ্ছিল।
ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ পতনের পরের কয়েক মাসে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। তারা লুটপাট ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকের কিছু ঘটনায় বিএনপি নতুন করে গতি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা করেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেয়ার পর কোনও বড় বিরোধ বা ভাঙন হয়নি; বরং এতে দল নতুন প্রাণ পেয়েছে।
বাংলাদেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই তার মা খালেদা জিয়া মারা যান। তার মৃত্যু তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি সহানুভূতির ঢেউ তুলতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো আসন্ন নির্বাচনে দলটির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়ার পথ মোটেও সহজ নয়, কারণ জামায়াতও ধীরে ধীরে শক্তি বাড়াচ্ছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত ও অন্যান্য ইসলামপন্থি সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করে এবং ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধে’ জড়িত ছিল। এর খেসারত জামায়াতকে দীর্ঘদিন দিতে হয়েছে। যদিও দলটির শক্তিশালী ও সুসংগঠিত তৃণমূল নেটওয়ার্ক আছে এবং রাজপথের উল্লেখযোগ্য শক্তিও আছে, তবু অতীতে তারা বড় কোনও নির্বাচনী সাফল্য পায়নি।
তবে এবার পরিস্থিতি বদলাতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত ভালো ফল করেছে। শহুরে তরুণদের মধ্যে তাদের সমর্থন বাড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবর্তন ও সুশাসনের প্রত্যাশায় থাকা অনেক ভোটারের কাছে জামায়াত এখন আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে।
আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও দলটির কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের সমর্থনভিত্তিও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ছিল। শেখ হাসিনার পতনের পর তা কিছুটা কমলেও এখনও এই ভোটব্যাংক বেশ বড়। এই ভোটাররা কীভাবে ভোট দেবেন, তা-ই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করতে পারে— বিশেষ করে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হলে।
এছাড়া মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮ থেকে ১০ শতাংশ হচ্ছে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। অতীতে তারা আওয়ামী লীগকে ‘ভোট দিতেন’। কিন্তু এবার বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই এখন এই ভোটব্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছে। হিন্দু ভোটাররা বলছেন, দুই দল থেকেই তারা ‘ভয়ভীতি ও চাপের’ মুখে পড়ছেন। এছাড়া নেতৃত্ব পর্যায়ে বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশে ফেরার পর প্রথম জনসভায় তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলেছিলেন, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও জায়গা থাকবে। জামায়াতের নাম না নিয়ে তিনি ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দেন, ‘১৯৭১ সালে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা (জামায়াত) ‘লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছিল’।’ অন্যদিকে জামায়াত তাদের স্বাধীনতাবিরোধী, নারী-বিদ্বেষী ও রক্ষণশীল ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে। গতস ডিসেম্বরের শেষ দিকে তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)-কে তাদের জোটে টানে।
এলডিপির নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াত আশা করছে, তার অন্তর্ভুক্তিতে ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকার কারণে তৈরি হওয়া নেতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও কাটবে। অন্যদিকে এনসিপি গড়ে উঠেছিল ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে এবং ধারণা করা হচ্ছিল, তারা তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের টানবে। কিন্তু দলের তুলনামূলক ধর্মনিরপেক্ষ অংশ ভেঙে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিএনপি না জামায়াত— কাকে ভোট দেবেন, তা নির্ভর করবে তারা অতীত ভুলে যেতে রাজি কি না তার ওপর। জামায়াত এখন দাবি করছে, তারা সংখ্যালঘু বা নারী-বিরোধী নয়। কিন্তু তাদের প্রার্থী তালিকাই ভিন্ন কথা বলছে। তারা মাত্র একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে এবং কোনও নারী প্রার্থী দেয়নি।
বিএনপির ক্ষেত্রে তারেক রহমান এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মধ্যপন্থি রাজনীতির কথা বললেও তার উদ্যোগেই অতীতে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। খালেদা জিয়া ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া অন্য সিনিয়র বিএনপি নেতারা নাকি সেই জোট নিয়ে ‘অস্বস্তিতে’ ছিলেন। এছাড়া বিএনপি এবার মাত্র দুজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
আরও পড়ুন: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়াই বিএনপির সিদ্ধান্ত: নজরুল ইসলাম
আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা এটাও বিবেচনায় নেবেন যে ভবিষ্যতের জন্য বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কে তুলনামূলক ভালো বিকল্প। বিএনপির ‘নতুন ভিশন’ তাদের কিছুটা এগিয়ে রাখছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে কয়েক দশকের বৈরিতা কি তারা ভুলতে পারবে?
আরও পড়ুন: কৌশলের নামে গুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপি নেতাকর্মীরা : তারেক রহমান
দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একে অপরের সরকার অচল করে দিয়েছে, রাজপথে ও নির্বাচনে মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়েছে। এখন সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকেরাই বিএনপির জয়ের ভাগ্য বদলে দেয়ার অবস্থানে আছেন। ভোটের দিনে তারা কি বিএনপিকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন?
দ্য ডিপ্লোম্যাট-এ নিবন্ধটি লিখেছেন সুধা রামচন্দ্রন। ভারতের বেঙ্গালুরুতে বসবাসকারী এই সাংবাদিক ম্যাগাজিনটির দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। তিনি নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
