চোখ রাঙাচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে দেখা দিতে পারে তীব্র খরা, দাবানল আর অতিবৃষ্টি। আগামী কয়েক সপ্তাহ ও মাসের মধ্যে বিশ্বজুড়ে নেমে আসতে পারে আবহাওয়ার চরম এ অবস্থা, যা অব্যাহত থাকতে পারে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী এল নিনোর তাণ্ডব চালানোর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। এ অবস্থায় যদি সুপার এল নিনো সক্রিয় হয়, তাহলে আরও খারাপ হতে পারে পরিস্থিতি। খবর ডেইলি মেইলের।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুপার এল নিনোর কারণে বিশ্বের অনেক দেশ তীব্র দাবদাহের কবলে পড়বে এবং অনেক দেশে হবে অস্বাভাবিক বৃষ্টি। বিজ্ঞানীরা তথ্য বিশ্লেষণ করে বলেছেন আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সুপার এল নিনো আঘাত হানবে। আর আগামী নভেম্বর পর্যন্ত এটির প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে, বিশ্বে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হতে পারে ২০২৬ সালে।
ধেয়ে আসছে ‘এল নিনো’, মহাবিপর্যয়ের শঙ্কা!
এদিকে আসন্ন ‘এল নিনো’ নিয়ে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে জাতিসংঘের আবহাওয়া বিষয়ক সংস্থা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থাও (ডব্লিউএমও)।
মঙ্গলবার (২ জুন) সংস্থাটি জানিয়েছে, জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে ‘এল নিনো’ সক্রিয় হওয়ার শঙ্কা ৮০ শতাংশ। আর আগামী নভেম্বরের মধ্যে এর শক্তি সঞ্চয়ের আশঙ্কা প্রায় ৯০ শতাংশ।
এছাড়া, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক ভিডিওবার্তায় বলেছেন, ‘আগামী মাসগুলোতে ৯০ শতাংশ নিশ্চিত বার্তা নিয়ে এল নিনো আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। বিশ্ববাসীকে এটিকে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, উষ্ণ বিশ্বের আগুনে আরও তেল ঢালবে এল নিনো। এটির প্রভাব হবে আরও ভয়াবহ। এবারের এল নিনোর প্রভাব হবে আরও সুদূরপ্রসারী। আগের চেয়ে আরও বেশি ধ্বংসাত্মক গতি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করবে এটি।
‘এল নিনো’ একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে। এর স্থায়িত্ব হয় প্রায় নয় থেকে ১২ মাস। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
ডব্লিউএমওর তথ্যমতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চল, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশ, হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার শিং খ্যাত অঞ্চল) এবং মধ্য এশিয়ায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। এর বিপরীতে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশে তীব্র খরা দেখা দিতে পারে। এছাড়া মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হ্যারিকেন বা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে সারা বিশ্ব যখন তীব্র মূল্যস্ফীতির সংকটে রয়েছে, তার মধ্যে সম্ভাব্য এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন চাপ তৈরি করতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের ওপর। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সালের মধ্যে পৃথিবীতে এমনই এক বিধ্বংসী সুপার এল নিনো এসেছিল। সেই সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় রেকর্ড খরা ও ফসল নষ্ট হয়েছিল। যার ফলে বিশ্বজুড়ে এক মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যান।
২০২৬ সালের সম্ভাব্য ‘এল নিনো’ সেই ইতিহাসকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। তবে, বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনকার পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, ১৫০ বছর আগে পৃথিবী আজকের তুলনায় অনেক ঠান্ডা ছিল। গত দেড়শো বছরে মানুষের তৈরি দূষণ আর গ্রিনহাউস গ্যাসের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়েছে। ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের অন্যতম উত্তপ্ত বছর। এই তপ্ত পৃথিবীর উপর যখন আরেকটি সুপার এল নিনোর প্রকোপ পড়বে, তখন খরা এবং দাবদাহের তীব্রতা যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব চেলেস্তে সাউলো এ ব্যাপারে বলেন, এর আগে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া বিগত এল নিনো পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। সেই চরম আবহাওয়ার কারণেই ২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল।
তিনি আরও সতর্ক করেন, তীব্র তাপদাহ ও খরার পাশাপাশি মশা ও অন্যান্য বাহকনির্ভর রোগের বিস্তার বাড়তে পারে। একইসঙ্গে, কমে যেতে পারে খাদ্য ও পানির সরবরাহ। ফলে সংকটে থাকা দরিদ্র দেশগুলোতে দেখা দিতে পারে চরম বিপর্যয়।