
বাঁচলে একসঙ্গেই বাঁচব, মরলে একসঙ্গেই মরব’- শুধুমাত্র মুখের কথা নয়, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই উক্তির সার্থকতা প্রমাণ করেছেন শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন। নিজের একটি কিডনি প্রিয়তমা স্ত্রীর শরীরে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত। দাম্পত্য জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে স্বামীর এমন নিঃস্বার্থ ত্যাগের কাহিনী এখন শরীয়তপুরজুড়ে মানুষের মুখে মুখে।
শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কুচাইপট্টি ইউনিয়নের বসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন ও মিনারা বেগমের বিয়ে হয় ২০০৭ সালে। এক সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে জসিমের ছিল সাজানো সংসার। কিন্তু ২০২৪ সালের শুরুতে হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটে। উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ৩২ বছর বয়সী মিনারা বেগমের দুটি কিডনিই বিকল হয়ে পড়ে। পরিবারের ওপর নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মিনারার চিকিৎসা শুরু হলেও কিডনি প্রতিস্থাপন ছিল সময়ের দাবি। প্রথমে মিনারার মা নিজের একটি কিডনি দিতে রাজি হলেও শারীরিক পরীক্ষায় তাঁর হার্টের রোগ ধরা পড়ায় তা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে জসিম যখন দিশেহারা, ঠিক তখনই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নেন। নিজের জীবনের পরোয়া না করে অর্ধাঙ্গিনীকে বাঁচাতে নিজের একটি কিডনি দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
চিকিৎসকদের সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে গত ৫ মার্চ ঢাকার শ্যামলী সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে জসিমের কিডনি মিনারার শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে তাঁরা দুজনেই সুস্থ আছেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। জসিম উদ্দিন বলেন, স্ত্রী কখনো আমায় কিডনি দিতে বলেনি, এটি ছিল আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। স্ত্রীকে সুস্থ দেখতে পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।

আবেগে আপ্লুত মিনারা বেগম বলেন, আমার স্বামী বলেছিলেন আমরা এক সঙ্গেই সব বিপদ মোকাবিলা করব। তাঁর দেয়া কিডনিতেই আজ আমি নতুন জীবন পেলাম। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান বর্তমানে ঢাকায় নবম শ্রেণিতে পড়ছে, যার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই জসিম এই সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
জসিমের এই মহানুভবতায় মুগ্ধ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও। কুচাইপট্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএম নাসির উদ্দিন স্বপন বলেন, জসিম উদ্দিন যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা বর্তমান যুগে বিরল। এটি কেবল ভালোবাসা নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের এক অসাধারণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
জসিম ও মিনারার এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, বরং বিপদের দিনে একে অপরের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর মধ্যেই সার্থকতা পায়। তাঁদের এই কাহিনী সমাজের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা, যা মানবতার জয়গান গায়।