৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৪শে চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
১৮ই শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

৩০ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে শিশুদের দোলনা বানিয়ে দেন মফিজার

spot_img
গ্রামে নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করলেই বাবা মায়েরা ছুটে আসেন তার কাছে। প্রাণের সন্তানের জন্য দোলনা বানিয়ে চান তারা। আসেন ছোট বড় অন্য শিশুরাও। এমন আবদারে বাঁশের দোলনা বানিয়ে দেন তিনি। ৮০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ এখনো দোলনা বানিয়ে উপহার দিয়েই চলেছেন। জীবনের পায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে গ্রামে দোলনা উপহার দিয়ে সবার প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছেন তিনি।

ঘোড়ামারা নদী ঘেরা একটি সীমান্ত গ্রামের নাম কাজী পাড়া। গ্রামের তিন দিকে ভারতীয় সীমান্তকে চিহ্নিত করেছে এই ঘোড়ামারা নদী। বিশাল কৃষি আবাদি জমির মাঝখানে ছোট ছোট্ট বাড়ি। কাঁচা পাকা ছোট ছোট আঁকা বাঁকা রাস্তা। বিস্তীর্ণ মাঠে  শীতের বিকেলের নরম রোদ। বাড়ির আঙ্গিনা জুড়ে ধানের পালা, পোয়ালের পুঞ্জি। আঙ্গিনা বা মাঠ জুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গরু,ছাগল, হাস, মুরগী সহ নানা ধরনের গৃহপালিত পশু প্রাণী। বিচরণ করছে পাখিদের দল। বাড়ির পাশের পুকুরে মাঝ ধরছে শিশুরা। গ্রামের অধিকাংশ নাগরিকই কৃষি কাজ করেন। এই গ্রামের পাশেই রয়েছে আরও কয়েকটি গ্রাম। এমন একটি গ্রামেই বসবাস করেন মফিজার রহমান। পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশি ইউনিয়নের কাজী পাড়া গ্রামের মফিজার রহমান প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর ধরে গ্রামের শিশুদের জন্য বাঁশের দোলনা বানিয়ে দিচ্ছেন।

নতুন শিশুকে ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ শীতের সকালের মোলায়েম রোদ পোহানোর জন্য প্রয়োজন একটি দোলনা। গ্রীষ্মে শীতল বাতাস আর ঝুপ বৃষ্টিতে ছোট্ট সোনামনিকে ঘুম পাড়ানোর জন্য প্রয়োজন একটি দোলনা। বাবু ঘুমাতে ঘুমাতে হাতের কাজ শেষ করার জন্যও মায়েদের প্রয়োজন একটি দোলনা। দোলনা থেকে ঘুম ভেঙে যাওয়া বাবুর হাসিমুখ দেখার জন্য বাবারও চাই একটি দোলনা। আর এই দোলনাই বানান মফিজার রহমান। কারো আবদার ফেলতে পারেন না তিনি। মনের সুখেই এই কাজ করেন। উপহার হিসেবে দিয়ে দেন শিশুদের। শুধু নতুন শিশু নয় তার কাছে দোলনার আবদার অন্য শিশুদেরও। তাদেরকেও বানিয়ে দেন দোলনা।

কেউ আবদার করলে দাও, বশিলা দিয়ে বাঁশ ঝাড় থেকে কেটে আনেন বাঁশ। তারপর বাঁশের ছোট্ট চারটি খুঁটিতে রশি দিয়ে বেধে বাতা আটকে দেন। অনেকটা ছোট্ট খাটের মতো দোলনা। তারপর রশি দিয়ে ঝুলিয়ে দেন গাছের ডালে, ঘরে বা বারান্দায়। দোলনায় ছোট্ট সোনামণিরা শুয়ে থেকে দোল খায়। মফিজার রহমান দোলনা বানিয়ে দিয়ে টাকা পয়সা নেন না কখনো। তবে খুশি হয়ে যে যা দেন তাই নিয়েই সন্তুষ্ট।

মফিজার রহমান বলেন, এখন গ্রামবাসীর আবদার ফেলতে পারি না। ৩০/৩৫ বছর থেকে গ্রামের ছোট্ট শিশুদের জন্য দোলনা বানিয়ে যাচ্ছি। এই কাজ করতে অনেক ভালো লাগে। খালি দোলনা নয় কৃষি কাজের জন্য নানা রকমের যন্ত্রপাতিও বানাই আমি। এ গ্রাম ও গ্রাম থেকে মানুষ আসে। আবদার করে। কেউ ১০/২০ টাকা দেয়। কেউ দেয়না। আমি কখনো টাকা চাইনা।
গ্রামে নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করলেই বাবা মায়েরা যেমন ছুটে আসেন দোলনা বানানোর জন্য তেমনি চাষিরাও ছুটে আসেন তাদের হাল কৃষির যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য। বিনা পয়সায় সব কছিু ঠিক ঠাক করে দেন তিনি।

মফিজার রহমানের  স্ত্রী বলেন বিয়ের পর থেকেই তিনি স্বামীকে দেখে আসছেন দোলনাসহ নানা কিছু জিনিসপত্র বানাতে।

মফিজার রহমান শিক্ষাগত যোগ্যতায় নিরক্ষর। সহজ সরল একজন চাষি তার নিজস্ব চেতনায় যে সেবা বিলিয়ে যাচ্ছেন তা সকল মানুষের জন্য প্রেরণা আর শিক্ষার ব্যাপার। এমন মন্তব্যই করছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ