প্রিয় শিক্ষক যখন চাকরিজীবন থেকে অবসরে যান, তখন বিদায়টা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকে না—তা হয়ে ওঠে অসংখ্য স্মৃতি, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতার মিলনমেলা। ঠিক এমনই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ভান্ডার পাইকাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. মেরিনা জাহান-এর অবসর উপলক্ষে বিদ্যালয়ে ছুটে আসেন বহু সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমান শিক্ষার্থী, সহকর্মী, অভিভাবক ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উপস্থিতিতে বিদায় অনুষ্ঠান পরিণত হয় এক হৃদয়স্পর্শী পুনর্মিলনীতে।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকাল ১১টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আয়োজিত অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শাজাহানপুর উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার উর্মি তালুকদার। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. আব্দুল লতিফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর মোহসিনুল হাসান, শাজাহানপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাজেদুর রহমান সবুজসহ শিক্ষক, অভিভাবক, বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা উর্মি তালুকদারের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল লতিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াহিদ, প্রভাষ চন্দ্র সরকার, আব্দুল্লাহ আল মামুন,উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের (ইউআরসি) ইন্সট্রাক্টর মো. মহিদুল হাসান।
চাঁচাইতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল হালিমের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন শাজাহানপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সাজেদুর রহমান সবুজ,বোহাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, অভিভাবক,তাঁর পরিবারের সদস্যরা, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানজুড়ে বারবার ফিরে আসে একজন আদর্শ শিক্ষকের কর্মময় জীবনের নানা স্মৃতি। বক্তব্য দিতে গিয়ে অনেক সাবেক শিক্ষার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা বলেন, আজ আমরা আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষাগুরুকে বিদায় জানাতে এসেছি। শ্রেণিকক্ষে তাঁর স্নেহমাখা পাঠদান, শাসনের আড়ালে থাকা মমতা আর মূল্যবোধের শিক্ষা আমরা কোনোদিন ভুলব না। তাঁর হাত ধরেই আমাদের অনেকেই আজ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছি।
শিক্ষার্থীরা আরও বলেন, মেরিনা জাহান শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন একজন বৃক্ষপ্রেমী, সৃজনশীল সংগঠক এবং মানবিক ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ের সৌন্দর্যবর্ধন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য।
দীর্ঘ ৩৫ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানলেন প্রধান শিক্ষক মোছা. মেরিনা জাহান। বিদ্যালয় সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর কর্মনিষ্ঠা, নেতৃত্ব ও শিক্ষার্থীদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা বিদ্যালয়টিকে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আয়োজকরা জানান, বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিদায়ী শিক্ষককে এত বড় পরিসরে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। ফলে অনুষ্ঠানটি কেবল বিদায় নয়, বরং বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের এক আবেগঘন মিলনমেলায় রূপ নেয়।
বিদায়ের ক্ষণে সংবর্ধনায় সিক্ত শিক্ষক মেরিনা রহমান সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকতা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। এই বিদ্যালয়, আমার সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভালোবাসা আমি সারাজীবন বয়ে বেড়াব। তোমরা মানুষ হও, দেশকে ভালোবাসো—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে ফুলেল শুভেচ্ছা, সম্মাননা স্মারক, আলোকচিত্র আর অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানান উপস্থিত সবাই। এক শিক্ষকের অবসর যেন শেষ নয়, বরং তাঁর আদর্শ ও শিক্ষা নতুন প্রজন্মের পথচলার অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবে—এমন প্রত্যাশাই ছিল সবার কণ্ঠে।