বগুড়ার শাজাহানপুরে চুরি মামলার আসামি এক গৃহকর্মীকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) কুদ্দুসের বিরুদ্ধে। রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তাকে মামলার বাদীর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন মামলার আসামি মোছা. মরিয়ম খাতুন (৩৪)।
অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবিতে বুধবার সকালে উপজেলার বিব্লক মহাসড়কে মানববন্ধন করেন মরিয়মের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা। পরে মামলার বাদী হাফিজা খাতুনের কর্মস্থল বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের কাছে তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে মরিয়ম অভিযোগ করেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অসুস্থ মায়ের সংসার চালিয়ে আসছেন। ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ রহিমাবাদ উত্তরপাড়ার হাসান আলী মিয়ার বাসায় কাজ করতে গেলে তার স্ত্রী হাফিজা খাতুন তাকে ওই দিন কাজ না করার কথা বলেন। পরে তার বিরুদ্ধে স্বর্ণালংকার চুরির অভিযোগ তুলে পরিবারের লোকজন তার বাবার বাড়িতে গিয়ে তল্লাশি ও ভাঙচুর করেন বলে দাবি করেন তিনি।
মরিয়মের ভাষ্য, ওই দিন বিকেলে মেহমান আসার কথা বলে হাফিজা তাকে বাসায় ডেকে নেন। পরে একটি কক্ষে আটকে রেখে স্বর্ণ চুরির কথা স্বীকার করতে চাপ দেওয়া হয়। তার মা ও বোনেরা তাকে খুঁজতে সেখানে গেলে তাদের সামনেও তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন মরিয়ম।
পরে তার মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে দুই ব্যক্তির মুচলেকা নিয়ে মা ও বোনের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। এর তিন দিন পর তার বিরুদ্ধে চুরি মামলা করা হয় বলে জানান মরিয়ম।
তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। পরে মামলায় রিমান্ড মঞ্জুর হলে প্রথমে জেলগেটে এবং পরে থানায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় ভয়ভীতি ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মরিয়মের অভিযোগ, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কুদ্দুস তাকে মামলার বাদী হাফিজা খাতুনের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে হাফিজা খাতুন, তার স্বামী হাসান আলী ও এক ভাড়াটিয়াসহ কয়েকজন তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করেন এবং মিষ্টি খাতুনের নাম বলার জন্য চাপ দেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন বলে দাবি করেন।
এ ছাড়া থানায় রিমান্ডে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের একটি ভিডিও পরবর্তীতে বাদীপক্ষের হাতে যায় এবং সেটি বিভিন্ন ব্যক্তিকে দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন মরিয়ম। ভিডিওটি কীভাবে বাদীপক্ষের হাতে গেল, সেটিও তদন্তের দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, একজন দরিদ্র গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে করা চুরির অভিযোগের পাশাপাশি রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। তারা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ও মরিয়মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
পরে বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের কাছে হাফিজা খাতুনকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পাশাপাশি মরিয়মের উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
মরিয়ম বলেন, আমি গরিব মানুষ। আমার তিন বছরের শিশু সন্তান রয়েছে। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আমার বিরুদ্ধে করা মামলা ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে ন্যায়বিচার চাই।
তবে এসব অভিযোগ অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত সাবেক এসআই কুদ্দুস, মামলার বাদী হাফিজা খাতুন এবং তার স্বামী হাসান আলী। তাদের বক্তব্য, মরিয়মের অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব ঘটনার কোনো মিল নেই।