
গতকাল বুধবার ছিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুলভ মূল্যে মাংস, ডিম ও দুধ বিক্রির ১৪তম দিন। সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে সোহাগ হোটেলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ১০-১২ জন ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবার লক্ষ্য গরুর মাংস। খাসির মাংস এ বছর নেই। আর গরুর মাংস ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যেই শেষ। মাংস শেষ হওয়ার পরপরই ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের সামনে ভিড় কমে যায়।
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরে আইডিয়াল স্কুলের সামনে গিয়ে দেখা যায়, এক নারী গরুর মাংস ফেরত দিতে এসেছেন। তিনি আগের দিন সরকারের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র থেকে মাংস কিনে বাসায় গিয়ে দেখেন অর্ধেকই হাড় এবং চর্বি। এ ছাড়া মাংসে পানি আছে। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে এই নারী বলেন, মাংসের মান একেবারেই খারাপ। হাড় এবং চর্বির পরিমাণ অনেক বেশি।
এভাবে রাজধানীর সাতটি এলাকা ঘুরে দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে দেখা গেছে, কোথাও গরুর মাংস নেই। বিক্রি শুরুর অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ। কড়াইল বস্তি এলাকায় যে ট্রাকটি আসে, তাতে বরাদ্দ ছিল সামান্য গরুর মাংস। ওই স্থানে আনসার ক্যাম্প এলাকার বাসিন্দা রাশেদা বেগম সকালেই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। মাংস পাননি। কিনেছেন মুরগি আর এক লিটার দুধ। রাশেদা বলেন, ‘ডিম ৯৬ টাকা, দোকানে ১০০ টাকা। চার টাকা কমের জন্য এতক্ষণ দাঁড়িয়ে লাভ কী? মাংসটাই দরকার ছিল।’ ষাটোর্ধ্ব মালেকা বেগমের কণ্ঠে ক্ষোভ। তিনি বলেন, দুদিন ঘুরেও মাংস পাই না। আধাঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও সুযোগ হলো না। বাজারের দামে কিনে খেতে পারি না বলেই এখানে আসি।’
কাকরাইলের ট্রাকে থাকা গরুর মাংস প্রথম ৩৫-৪০ জনের মধ্যেই শেষ। বাজারদরের চেয়ে কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কম– এই হিসাবেই মানুষের ভিড় ছিল। মোহাম্মদপুরের বিক্রয়কেন্দ্রে এক ঘণ্টাও হয়নি ট্রাক এসেছে। এর মধ্যেই মাংস শেষের ঘোষণা। তখন লাইন ভেঙে অনেকে চলে যান। ক্রেতা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘উদ্যোগ ভালো। কিন্তু গাড়িতে মাংস খুব কম। পরিমাণ বাড়ালে কাউকে খালি হাতে ফিরতে হতো না।’ আদাবরের বাসিন্দা আজাদ আল-আমিন এক কেজি গরু, এক কেজি ড্রেসড ব্রয়লার, এক লিটার দুধ ও এক ডজন ডিম কিনেছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা, ‘গত বছরও নিয়েছি। এবার মাংসে চর্বি আর হাড় বেশি। পানিও আছে। সে হিসেবে ৬৫০ টাকা দাম বেশি হয়ে যায়।’
ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষার পর এক কেজি মাংস পেয়েছেন মাহফুজুর রহমান। তিনি বললেন, ‘গরুর মাংস দুই কেজি দিলে ভালো হতো। অন্তত দেড় কেজি দিলেও হয়।’
এ বছর ২৬টি এলাকায় গরু ও মুরগির মাংস, ডিম ও দুধ বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৬৫০ টাকা, ড্রেসড ব্রয়লার ২৪৫ টাকা, ডিম ডজন ৯৬ টাকা, দুধের লিটার ৮০ টাকা। একজন ক্রেতা এক কেজি গরুর মাংস, একটি মুরগি, এক লিটার দুধ ও এক-দুই ডজন ডিম কিনতে পারেন। ২৫ রমজান পর্যন্ত মোট ২৬ দিন চলবে বিক্রি। কিন্তু ডিমে সুবিধা কম। রাজধানীর কয়েকটি বাজারে লাল ডিমের ডজন ১০০ টাকার মধ্যেই। এমনকি স্বপ্ন সুপার শপে ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজন ১০০ টাকা, মীনা বাজারে ডজন ৯৯ টাকা এবং প্রিন্স বাজারে বিক্রি হচ্ছে ডজন ৯৬ টাকায়। ফলে ৯৬ টাকায় কিনতে লাইনে দাঁড়াতে গ্রাহকদের অনীহা দেখা গেছে। ফলে শুধু ব্রয়লার মুরগি ও দুধ নিয়েও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে বিক্রয়কর্মীদের।
অন্যান্য বছর দৈনিক প্রায় পাঁচ হাজার কেজি গরুর মাংস বিক্রি হলেও এবার হচ্ছে প্রায় এক হাজার কেজি। ২০২৪ সালে ৩০ এলাকা ও পাঁচটি বাজারে মাছ, দুধ, ডিম, মুরগি, গরু ও খাসির মাংস বিক্রি হয়েছিল। তখন গরুর মাংস ছিল ৬০০ টাকা, খাসি ৯০০ টাকা কেজি। এবার খাসি নেই। ২০২৪ সালে মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে জীবন্ত মাছ বিক্রি সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু গত বছর থেকে সেই কার্যক্রম বন্ধ। ফলে আমিষের তালিকা থেকে মাছ বাদ গেছে। এলাকা কমে হয়েছে ২৬টি।
এবার গরুর মাংস সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন। ডিম ও মুরগি বিক্রি তদারকি করছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল। ডিম, মুরগি ও দুধের মান ভালো হলেও গরুর মাংস নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের গরু সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত। এই সংগঠনের অনেক নেতার নিজস্ব খামার নেই। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিজস্ব শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্লটার হাউসও নেই। সিটি করপোরেশনের স্লটার হাউস ব্যবহারের উপযোগী নয় বলে জানা গেছে। গত বছর থেকে রাজধানীর বাড্ডার একটি স্থানে বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন গরু জবাই করছে। সরকারি খামার থেকে ভর্তুকিতে গরু দেয়, সংগঠনটি সেই গরু প্রস্তুত করে ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের গাড়িতে সরবরাহ করে।
পুরো কার্যক্রম তদারকি করছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শরিফুল হক। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন চাহিদা অনুযায়ী মাংস দেওয়া হচ্ছে। অন্য বিষয়ে মন্তব্য করব না।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান বলেন, আমরা ডিমের দাম কমানোর চিন্তা করছি। আর চেষ্টা করেছি গরুর মাংসের পরিমাণ বাড়ানোর। গরুর মাংসের পরিমাণ আরও বাড়বে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এতে লাখ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। এত বড় কার্যক্রমে কিছু ত্রুটি থাকলেও আমরা তা ঠিক করার চেষ্টা করছি।




