একসময় বিকাল মানেই ছিল মাঠে ছুটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর হইচই। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইল ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের স্ক্রিন। একক পরিবার, ব্যস্ত নগরজীবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিটি দিনে শিশুদের শৈশব ক্রমেই আটকে যাচ্ছে ডিজিটাল পর্দার ভেতর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের ঘুম কমছে, বাড়ছে চোখের সমস্যা, স্থূলতা, খিটখিটে মেজাজ ও মানসিক অস্থিরতা। এমনকি শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পাঁচ বছর বয়সী ইরা। ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমানো পর্যন্ত মোবাইল ফোন হাত থেকে নামে না। মোবাইল নিতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার শুরু করে। মাস কয়েক আগে হঠাৎ অশ্লীল শব্দে গালি; বড়দের মতো আচরণ করে। ইরার স্কুলশিক্ষিকা মা বলেন, আমি সারাদিন স্কুলে থাকি। ইরার বাবাও সকালে ব্যবসার কাজে বের হয়ে যান। প্রচণ্ড ব্যস্ত জীবন। কাজের মেয়ের কাছে ইরা সারাদিন থাকে। ছোটবেলায় খেতে চাইত না। মোবাইলে কার্টুন দেখালে খেত। এরপর মা-বাবা সবার চেয়ে মেয়ের প্রিয় হয়ে উঠে মোবাইল। এর মধ্যে মাঝেমধ্যে চোখে ব্যথার কথা বলে। তবে হাত থেকে মোবাইল ছাড়ে না। এক মাস আগে ইরার মুখে খুবই অশ্লীল শব্দ শুনে থমকে যান। বুঝতে পারেন সন্তানের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। তিনি স্কুলে থাকতে ফাঁকা বাসায় কাজের মেয়ে ইরার সামনেই অশ্লীল ভিডিও দেখে। তিনি জানান, স্কুল থেকে এক মাসের ছুটি নিয়েছেন। পুরোটা সময় মেয়েকে দিয়ে সন্তানের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ছোট ইরা নয়, অধিকাংশ শিশু এখন হাঁটতে শেখার আগেই স্ক্রিনে অভ্যস্ত হচ্ছে। শিশুরা প্রকৃতি দেখা বা খেলাধুলার চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়। ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে পাঁচ ঘণ্টা মোবাইল-ল্যাপটপের মতো ডিজিটাল স্ক্রিনে কাটায়। যৌথ
পরিবার ভেঙে যাওয়ায় এখন ধীরে ধীরে গ্রামের শিশুরাও খেলার সঙ্গী হারাচ্ছে; মোবাইলে হয়ে উঠছে সার্বক্ষণিক সঙ্গী। ফলে শিশুরা চোখের রোগসহ শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির গবেষণা বলছে, ঢাকার অনেক শিশু মোবাইল, টিভি, ট্যাব বা কম্পিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। ফলে তাদের ঘুম কমে যাচ্ছে, ওজন বাড়ছে, মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা হচ্ছে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের (তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম) ৬ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর এই গবেষণাটি করা হয়।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে ২ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। বাবা-মায়ের উচিত সন্তানদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করার জন্য তাদের বাইরের খেলাধুলা, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ডিজিটাল ডিভাইস-মুক্ত পারিবারিক সময় কাটাতে উৎসাহিত করা। শিশুদের বিতর্ক, দলবদ্ধভাবে পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া এবং টবের গাছের যত্ন নেওয়ার মতো ভালো ও সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচজন শিশুর মধ্যে চার শিশু (৮৩ শতাংশ) প্রতিদিন ২ ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রায় ২ ঘণ্টার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে। গড়ে শিশুরা স্মার্টফোন, টেলিভিশন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং গেমিং ডিভাইসে দিনে প্রায় ৪.৬ ঘণ্টা সময় কাটায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথাব্যথায় ভুগছে। যারা দিনে ২ ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তারা গড়ে মাত্র ৭.৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যা এ বয়সের শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার শিকার এবং যারা বেশি স্ক্রিন ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে এ হার বেশি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের অভাব স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকায় শারীরিক পরিশ্রম ও খেলাধুলা কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায়।
চক্ষু বিশেষজ্ঞ, পেডিয়েট্রিক ও ফ্যাকো সার্জন ডা. জামসেদ ফরিদী জামি আমাদের সময়কে বলেছেন, শিশুদের অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, চোখের সমস্যা, স্থূলতা, উদ্বেগ এবং পড়াশোনায় দুর্বল ফলাফলের যোগসূত্র রয়েছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা এবং মনোযোগ কমিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে শিশুদের অন্যদের সঙ্গে সরাসরি মেলামেশা কমে যায়, যা তাদের মন-মেজাজ, অনুভূতি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং শিশুদের বাড়িতে ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর এবং ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এজন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সহজ নির্দেশিকা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অদৃশ্য মহামারী নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপমূলক গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম শুরু করার এখনই উপযুক্ত সময়।
আইসিডিডিআর,বির অ্যাসিস্টেন্ট সায়েন্টিস্ট ডা. শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, বারবার মাথাব্যথা বা চোখের অস্বস্তি, অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বাইরের খেলাধুলার প্রতি অনীহা অথবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করলে শিশুদের জন্য বিপদ বাড়তে পারে।
চলতি বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যের ইস্ট অ্যাঙ্গলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডনের বিজ্ঞানীরা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের স্ক্রিন দেখার সময় তাদের চোখের গতিবিধি, হৃদস্পন্দনের হার এবং মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যেখানে এক সেকেন্ডে একটি দৃশ্য বা ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারে, একটি ছোট শিশুর মস্তিষ্ক সেই একই তথ্য বিশ্লেষণ করতে সময় নেয় প্রায় দশগুণ। ফলে ইউটিউব, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস বা কার্টুনের দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্যগুলো শিশুর এই ধীর মস্তিষ্কের জন্য একটি অসহ্য চাপ তৈরি করে। এতে শিশু চেয়ারে বসে থাকলেও তার হৃদস্পন্দন বাড়ে। ফলে শিশু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও সহজে উত্তেজিত হয়, ছোট বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদে শিশুর মনোযোগ ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি এবং শিক্ষার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
শিশুদের স্ক্রিন আসক্তির ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে অনেক দেশ জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। গত ২৭ মার্চ ইংল্যান্ড সরকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য স্ক্রিন সময়সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, দুই বছরের কম বয়সী শিশুর জন্য একা স্ক্রিন দেখানো সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলতে হবে। তবে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলের মতো যৌথ কার্যক্রম ব্যতিক্রম হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সীদের জন্য দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা স্ক্রিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এসময়টুকুও অভিভাবকদের সঙ্গে বসে দেখতে হবে। খাবার সময় এবং ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে স্ক্রিন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার ফার্মগেটের ব্যবসায়ী আবুল হাশেম বলেন, শিশুর কান্না থামাতে, খাওয়াতে, ঘুম পাড়াতে কিংবা শিশুকে ব্যস্ত রাখতে বাবা-মা হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছে। এ সহজ সমাধান অজান্তেই তৈরি করছে ভয়াবহ ডিজিটাল ডিভাইস আসক্তি। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য অভিভাবকদের দায়িত্ব নিজে মোবাইল আসক্তি কমিয়ে শিশুর সামনে ভালো উদাহরণ তৈরি করা। শিশুর হাতে গল্পের বই, রঙিন খাতা, খেলনা তুলে দেওয়া এবং প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, তার বাসায় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের জন্য একটি নির্দিষ্ট রুটিন করে দিয়েছেন। সেই রুটিন বাসার সবাই মেনে চলেন। এ ছাড়া সপ্তাহে একদিন ‘নো ডিভাইস ডে’ পালন করেন। এতে করে তাদের পরিবারের ক্রিন আসক্তি অনেক কমে এসেছে।




