৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৬শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আধুনিকতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে পুরুষের ‘গায়রত’

spot_img

মো: আব্দুল হান্নান:

‎একসময় পুরুষের অলংকার ছিল গায়রত তথা পুরুষের আত্মমর্যাদাবোধ মর্যাদা। বর্তমান আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আর প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারের আড়ালে মুসলিম সমাজের এক অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ‘গায়রত’ বা আত্মমর্যাদাবোধ ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অপব্যবহারের ফলে আজ অনেক পুরুষ তাদের চিরচেনা পৌরুষদীপ্ত গায়রত হারিয়ে ফেলছেন, যা ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
‎​
‎​ইসলামে ‘গায়রত’ বলতে নিজের পরিবারের নারীদের পরপুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত দৃষ্টি বা বেপর্দা থেকে রক্ষা ও তাদের সম্মান রক্ষায় পুরুষের অন্তরের পবিত্র জেদ এবং রক্ষণশীল মানসিকতাকে বোঝায়। এটি কেবল একটি আবেগ নয়, বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

‎আত্মমর্যাদাবোধের প্রশ্নে ইসলামের মনীষীরা ছিলেন আপসহীন। সাহাবীগন নিজের স্ত্রীর নাম কেউ জানুক সেটাও অপছন্দ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সৃষ্টির সেরা গায়রতসম্পন্ন ব্যক্তি। সাদ ইবনে উবাদা (রাঃ) বলেন, আমি যদি আমার স্ত্রীর সাথে পরপুরুষকে দেখি তবে তরবারি দিয়ে তাকে আঘাত করব। রাসূল (সা.) তখন সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন: ​”তোমরা কি সা’দ-এর গায়রত দেখে অবাক হচ্ছো? আমি তার চেয়েও বেশি গায়রতসম্পন্ন, আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশি গায়রতসম্পন্ন।” (সহিহ বুখারি)

‎​বর্ণিত আছে, একদিন এক ব্যক্তি আলী ইবনু আবি তালিব (রা.)-কে তাঁর স্ত্রী কেমন আছে জিজ্ঞেস করলে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, যদি রক্ত হালাল হতো তবে তিনি তরবারি দিয়ে সেই ব্যক্তির মস্তক দ্বিখণ্ডিত করতেন (ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া)। এমনকি মক্কার এক মুশরিক তার উটকে জবেহ করে দিচ্ছিলো। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি উটটি জবেহ কেন করলেন? আপনার টাকার প্রয়োজন হলেতো বিক্রি করে দিতে পারতেন। তখন লোকটি বললো, এই উটের উপর আমার মহিলারা বসতো, বিক্রি করে দিলে এই উটের উপর অন্যপুরুষ বসবে এটা আমার সহ্য হবে না, তাই এই উটই আমি রাখবো না। মুশরিক হওয়া সত্বেও তিনি গায়রত বুঝেছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম পুরুষ আজ জানেই না ‘গায়রত’ আসলে কী?

‎​আধুনিকতার নামে ‘ভদ্র’ সমাজের ট্রেন্ড
‎​বর্তমানে এক অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু হয়েছে। স্ত্রীকে সাথে নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা ও হাসি-তামাশায় মত্ত থাকাকেই আধুনিকতা মনে করা হচ্ছে। বিয়ের সময় হবু স্ত্রীকে বন্ধুদের দেখিয়ে মতামত নেওয়া বা স্ত্রীর সৌন্দর্যকে অন্যের সামনে উপস্থাপন করা এখনকার তথাকথিত ‘ভদ্র সমাজের’ ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে।

‎​প্রযুক্তির অপব্যবহার ও নৈতিক পতন
‎​ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে বর্তমানে এক ভয়াবহ নৈতিক পতন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর’ হওয়ার নেশায় অনেক স্বামী তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভিডিও তৈরি করছেন। মুসলিম নারীরা আঁটোসাটো বোরখা, হিজাব-নিকাব পরে তৈরি করছেন অশালীন ভিডিও। লোকচক্ষুর অন্তরালে যা থাকার কথা ছিল, তা আজ লাইক-ভিউয়ের আশায় সর্বসাধারণের সামনে প্রদর্শন করা হচ্ছে। দম্পতিদের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত, কর্মস্থল থেকে বেডরুমের কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি সম্বলিত এসব ‘কাপল ভিডিও’ সমাজে অশ্লীলতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
‎​
‎​সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই নির্লজ্জ কাজে ঘরের পুরুষরাই সরাসরি সহযোগিতা করছেন। আধুনিকতার নামে এই বেহায়াপনাকে মেনে নেওয়া মূলত পৌরুষত্বেরই পরাজয়। ইসলামি পরিভাষায় গায়রতগীন পুরুষকে ‘দাইয়্যুস’ বলা হয়। দাইয়্যুসের পরিণতি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি করে বলেছেন: ​”আল্লাহ তাআলা দাইয়্যুসের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন। দাইয়্যুস ঐ ব্যাক্তি যে তার পরিবারের অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ)
‎​
‎​মুসলিম উম্মাহর হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে হলে পুরুষের হারানো ‘গায়রত’ পুনঃরায় জাগ্রত করা জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও পর্দার বিধান বজায় রাখা অপরিহার্য। নতুবা তথাকথিত আধুনিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে দাইয়্যুস হয়ে বেঁচে থাকা পরকালীন জীবনে চরম ধ্বংস ডেকে আনবে। সমাজ সচেতনদের মতে, পারিবারিক ধর্মীয় মূল্যবোধই পারে এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ