১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩১শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

শাজাহানপুরে রিমান্ডে নিয়ে বাদীর বাড়িতে গৃহকর্মীকে মারধরের অভিযোগ

spot_img

বগুড়ার শাজাহানপুরে চুরির মামলার এক নারী আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে বাদীর বাড়িতে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে পুলিশের এক উপপরিদর্শকের (এসআই) বিরুদ্ধে। ওই নারীর দাবি, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কুদ্দুস তাকে বাদীর বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে বাদী ও তার স্বামীসহ কয়েকজন তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করেন এবং মামলার ঘটনায় অন্য এক নারীর নাম বলার জন্য চাপ দেন।

অভিযোগকারী ওই নারী হলেন মোছা. মরিয়ম খাতুন (৩৪)। তিনি শাজাহানপুর উপজেলার ফুলকোট গ্রামের বাসিন্দা। স্বামী পরিত্যক্ত মরিয়ম তার তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে অসুস্থ মায়ের সঙ্গে বসবাস করেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন।

মরিয়মের লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ সকালে তিনি নিয়মিত কাজ করতে রহিমাবাদ উত্তরপাড়ায় হাসান আলী মিয়ার বাসায় যান। সেখানে হাসান আলীর স্ত্রী হাফিজা খাতুন তাকে সেদিন কাজ না করে চলে যেতে বলেন। পরে একই দিন দুপুরে হাফিজা খাতুন তার স্বামীসহ কয়েকজনকে নিয়ে মরিয়মের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার চুরির অভিযোগ করেন। সেখানে দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালিয়েও কোনো স্বর্ণ না পেয়ে ঘরে ভাঙচুর করা হয় বলে দাবি করেন মরিয়ম।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ওই দিন বিকেলে হাফিজা খাতুন মরিয়মকে তার বাসায় নিয়ে যান। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে চুরি করা স্বর্ণের কথা স্বীকার করানোর জন্য তাকে মারধর ও মানসিক চাপ দেওয়া হয়।

মরিয়মের দাবি, বিষয়টি জানতে পেরে তার মা ও বোনেরা হাফিজা খাতুনের বাসায় গেলে প্রথমে দরজা খোলা হয়নি। পরে তার কান্নার শব্দে দরজা খোলা হলে তারা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। একপর্যায়ে শাজাহানপুর থানায় খবর দেওয়া হলে এসআই নুরুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুই ব্যক্তির মুচলেকায় তাকে মা-বোনের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

তবে মরিয়মের দাবি, পরদিন তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে হয়। এর তিন দিন পর, ২৭ মার্চ তার বিরুদ্ধে চুরির মামলা করা হয়।
মামলায় ২১ ভরি স্বর্ণের মধ্যে তিন ভরি স্বর্ণ মরিয়ম রান্নাঘরের কার্নিশ থেকে বের করে দিয়েছেন এবং বাকি ১৮ ভরি স্বর্ণ উদ্ধারের বাকি রয়েছে—এমন অভিযোগ করা হয়েছে বলে মরিয়ম দাবি করেন। তবে তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাদীপক্ষের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই তাদের ছোট মেয়ে রান্নাঘর থেকে স্বর্ণ বের করে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে ৬ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে পুলিশ মরিয়মকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। প্রায় ছয় মাস কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে জানান।
মরিয়মের আরও অভিযোগ, মামলায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হলে প্রথমে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। সেখানে কাঙ্ক্ষিত তথ্য না পাওয়ার পর পুনরায় থানায় রিমান্ডের আবেদন করা হয়। পরে থানায় রিমান্ডে এনে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং জোরপূর্বক ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয়।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কুদ্দুসকে ঘিরে। মরিয়মের ভাষ্য, থানায় রিমান্ডে থাকা অবস্থায় এসআই কুদ্দুস তাকে বাদী হাফিজা খাতুনের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে হাফিজা খাতুন, তার স্বামী হাসান আলী ও ভবনের এক ভাড়াটিয়াসহ তিনজন তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করেন। একই সঙ্গে মিষ্টি খাতুন নামে এক নারীর নাম বলার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
মরিয়মের দাবি, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন। পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় আইনজীবীর মাধ্যমে ওই জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেন।

অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর মুচলেকায় মা-বোনের জিম্মায় ছেড়ে দিলেও মামলার এজাহারে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমনকি থানায় রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় ধারণ করা ভিডিও কীভাবে বাদীপক্ষের হাতে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তার অভিযোগ, ওই ভিডিও গ্রামের বিভিন্ন মানুষের কাছে দেখিয়ে তাকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এতে তার গৃহপরিচারিকার কাজেও বিঘ্ন ঘটছে এবং সামাজিকভাবে তিনি ও তার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

মরিয়ম বলেন, বাদীপক্ষের লোকজন বিভিন্ন সময়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। বিশেষ করে তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এ ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন, ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণের প্রক্রিয়া তদন্ত এবং অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মরিয়ম ও তার পরিবার।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত এসআই কুদ্দুস, মামলার বাদী হাফিজা খাতুন ও তার স্বামী হাসান আলীর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে তা যুক্ত করা হবে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ