
প্রত্যন্ত গ্রামের শানেরহাট বাজারটি বেশ বড়। বাদশা মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে খুঁজতে তাই এ দোকান–ও দোকানে জিজ্ঞাসা করতে হলো। মনিরুল নামের এক দোকানি চিনতে পারলেন। নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাল্টা জানতে চান, ‘গাছের বন্ধু বাদশাকে খুঁজছেন?’
হ্যাঁ-সূচক উত্তর পেয়ে বাজারের মসজিদ প্রাঙ্গণে একটি আমগাছ দেখিয়ে মনিরুল জানালেন, সেটি বাদশা মিয়ার লাগানো। বাদশার কাছে নিজের লাগানো গাছগুলো সন্তানের মর্যাদা পায় উল্লেখ করে মনিরুল বলেন, তিনি দেখেছেন, ওই আমগাছটি কী গভীর মমতায় বড় করেছেন বাদশা! বাজারে এলেই গাছটি ছুঁয়ে আদর করেন তিনি।
বাদশা মিয়ার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে শানেরহাট ইউনিয়নের মেষ্টা গ্রামে। স্থানীয় লোকজন ভালোবেসে তাঁকে ‘গাছের বন্ধু বাদশা’ নামে ডাকেন। তাঁর পেশা দিনমজুরি হলেও নেশা গাছ লাগানো। নিজের টাকায় রাস্তার পাশে, হাটবাজার ও গ্রামের মোড়ে, ঈদগাহ, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে ২০ বছর ধরে গাছের চারা লাগিয়ে চলেছেন তিনি। এখন তাঁর লাগানো গাছের ফল খান এলাকার মানুষ। গাছের ছায়ায় বসে মনপ্রাণ জুড়ায় পথচারীরা।
এলাকার অনেকেই বাদশাকে ‘পাগল’ বলে উপহাস করতেন বলে জানালেন মেষ্টা গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মোফাজ্জল হোসেন। তিনি বলেন, কটুকথায় বাদশা থামেননি। সবাইকে বুঝিয়েছেন গাছের উপকারিতার কথা। এখন সবাই তাঁর পাগলামির সুফল ভোগ করছেন।
মেষ্টা গ্রামের ফসলি মাঠের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে শানেরহাট-বড়দরগা পিচঢালা সড়ক। সড়কের দুই পাশে সারি সারি নানা ফলের গাছ। সম্প্রতি (গত ২৭ সেপ্টেম্বর) সেই পথ ধরে বাদশার বাড়িতে ঢুকেই মন জুড়িয়ে যায়। গাছে গাছে সাজানো লম্বা পথ পেরিয়ে তারপর আধা পাকা টিনশেড বাড়ি। পথের দুই পাশে সবজি, ফল আর ফুলের গাছ। তবে বাড়িতে কাউকে পাওয়া গেল না।
বাদশাকে খুঁজতে যেতে হলো শানেরহাট বাজারে। সেখানে দেখা গেল, বাদশা পথের ধারে লাগানোর জন্য চারাগাছ কিনছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি বড়দরগা–শানেরহাট সড়কে নিয়ে গেলেন। দেখালেন, দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিজের লাগানো গাছ। গাছের নিচে নিজের হাতে স্থাপন করা একটি বাঁশের বেঞ্চে বসে শোনালেন গাছ লাগানোর গল্প।
কৃষকের সন্তান বাদশা মিয়া আর্থিক অনটনে লেখাপড়া করতে পারেননি। সাত বছর বয়সে তিনি মাঠে ছাগল, গরু চরানোর কাজ শুরু করেন। একটু বড় হওয়ার পর পেশা দাঁড়ায় দিনমজুরি। সংসারে তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে। কৃষিজমি নেই। চার শতক জমির ওপর তাঁর বাড়ি।
স্থানীয় লোকজন জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে শুক্রবার এলেই ৭২ বছর বয়সী বাদশা মিয়া বাইসাইকেলের পেছনে গাছের চারা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ইউনিয়নের যেকোনো মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের পর গাছের উপকারিতা সম্পর্কে লোকজনকে ধারণা দেন। গাছের চারা উপহার দিয়ে গাছ লাগানোরও পরামর্শ দেন।




