
মাসুম হোসেন:
মধ্যরাতে রাজধানীর একটি ফ্ল্যাট থেকে ফোন আসে। খবর আসে আত্মহত্যা করেছেন নাজিয়া। তার মরদেহ দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন মা। ময়নাতদন্তের পর তাকে লাশ দেখতে দেওয়া হয়। সেইসাথে তাকে বলা হয়, ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন তার মেয়ে নাজিয়া।
তবে এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা মানতে নারাজ নাজিয়ার পরিবার। নাজিয়াকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। অভিযোগের তীর তার স্বামী সরকারি কর্মকর্তা মিনহাজুল ইসলামের দিকে।
নাজিয়ার পরিবারের অভিযোগ, তারা হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলেন। অথচ পুলিশ জোর করেই আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা করে নিয়েছে। নাজিয়ার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ধামাচাপা দিতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন রাজধানীর পল্লবী থানা পুলিশের ওসি একেএম আলমগীর জাহান।
তবে, থানায় হত্যা মামলা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে আদালতে খুনের মামলা করেন নাজিয়ার মা।
২৮ বছরের নাজিয়া বিনতে রিয়াজ বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার ফুলতলা কানপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম রিয়াজ হোসেন খোকন।
অভিযুক্ত ৪৬ বছর বয়সী মিনহাজুল ইসলাম বগুড়া সদর উপজেলার ইসলামপুর হরিগাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তিনি মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (অনসাইট সুপার ভিশন-২ শাখা) যুগ্ম পরিচালক (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত)।
নাজিয়ার পরিবারের অভিযোগ, উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে হত্যাকে আত্মহত্যা বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন মিনহাজ।
জানা যায়, ২০২৪ সালে মিনহাজুল ইসলামের পক্ষ থেকে নাজিয়ার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব আসে। মিনহাজুলের বয়স বিবেচনায় তখন নাজিয়ার পরিবার ওই প্রস্তাবে রাজি হয়নি।
পরিবারের অভিযোগ, এরপর গোপনে নাজিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন মিনহাজুল। অর্থনৈতিক অবস্থান ও নানা প্রলোভনে নাজিয়াকে বিয়ের জন্য রাজি করান তিনি। একপর্যায়ে ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের পর রাজধানীর পল্লবী থানা এলাকায় বসবাস শুরু করেন নাজিয়া ও মিনহাজ।
অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই নাজিয়াকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করে আসছিলেন মিনহাজুল।
নাজিয়ার মা জেসমিন আক্তার জানান, মিনহাজুল প্রায়ই নিজের প্রভাবশালী অবস্থান উল্লেখ করে বলতেন তিনি একজন বড় কর্মকর্তা, চাইলে সবই করতে পারেন। প্রথমে তার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ার অপমানের প্রতিশোধ নিতেই নাজিয়াকে বিয়ে করেছেন তিনি।
গত ১৯ জানুয়ারি রাত ১২টার দিকে নাজিয়ার ছোট বোন নুরিয়া বিনতে রিয়াজকে মোবাইলে ফোন করেন মিনহাজুল ইসলাম। ওই সময় মিনহাজুল জানান নাজিয়া আত্মহত্যা করেছেন।
নাজিয়ার ছোটবোন জানান, ওই রাতে নাজিয়া মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেছেন। রাত পৌনে ১১ টার দিকে নাজিয়া তার সঙ্গে স্বাভাবিক কথাবার্তা বলেন। এ সময় পর্যন্ত মিনহাজুলের সঙ্গে তার কিছু হলে তা নাজিয়া বলতেন বা বোঝা যেত। অথচ পুলিশ বলছে, ওই দিন রাত সাড়ে ১০ টা থেকে পৌনে ১২টার মধ্যে আত্মহত্যা করেছেন নাজিয়া।
নাজিয়ার পরিবার জানায়, মিনহাজুল দাবি করেন পাশের রুমে গিয়ে আত্মহত্যা করেছেন নাজিয়া।
নাজিয়ার মা বলেন, খবর পেয়ে ভোরে আমরা পল্লবী থানায় যাই। সেখানে আমার মেয়ের মরদেহ ছিল না। আমরা পৌঁছানোর আগেই লাশ হাসপাতালের মর্গে নিয়ে রাখা হয়। ওই সময় মেয়েটাকে দেখতেও পারিনি। ময়নাতদন্তের পর লাশ বুঝিয়ে দেয় পুলিশ। নাজিয়াকে নির্যাতন করেই হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের আগে অনেকবার লাশ দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুলিশ দেখতে দেয়নি।
নাজিয়ার পরিবারের অভিযোগ, তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পল্লবী থানা পুলিশের ওসি একেএম আলমগীর জাহান তা গ্রহণ করেননি। জোর করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করান ওসি। ওসির সঙ্গে মিনহাজুলের সখ্যতা রয়েছে। সেকারণে হত্যা মামলা নেওয়া হয়নি। ওসির করানো আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় কী লেখা হয়েছিল ওই সময় সেটাও তারা জানতেন না।
জেসমিন আক্তার বলেন, ওসি একটা কাগজে আমার কাছ শুধু স্বাক্ষর নেন। পরে জানতে পারি আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা করা হয়েছে। কিন্তু আমি তো হত্যা মামলা করতে চেয়েছিলাম। ওসি হত্যা মামলা করতে দেননি।
তিনিসহ তার পরিবারের সদস্যরা প্রশ্ন রেখেছেন, লাশ উদ্ধারের ঘটনায় ওসি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে, নাজিয়া আত্মহত্যা করেছেন? তদন্তের আগেই ওসি এটাকে আত্মহত্যা বলেছেন।
নাজিয়ার মা জানান, এ ঘটনার একদিন পর ২১ জানুয়ারি সেই মামলায় মিনহাজুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরবর্তীতে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি জামিনে বের হন মিনহাজুল। এরপর থেকেই তাদেরকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। বলছেন মামলা করে আমার কিছুই করতে পারবেন না।
এদিকে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি মিনহাজুলকে কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্তের আদেশে স্বাক্ষর করেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
এ ব্যাপারে মিনহাজুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মুঠোফোনের নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
পল্লবী থানা পুলিশের ওসি একেএম আলমগীর জাহান জানান, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নাজিয়ার মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছেন। থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, থানায় হত্যা মামলা নেওয়া হয়নি- এ অভিযোগ সঠিক না। মৃতের স্বজনরা আদালতে একটি হত্যা মামলা করেছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একই ঘটনায় দুই মামলা হয় না। সেকারণে আদালতের মামলার কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। থানায় হওয়া মামলার তদন্ত চলছে। তদন্ত অনুযায়ী পরবর্তী আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




