
মঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:
মারুফ হোসেন বাবু—সদালাপী, মিশুক প্রকৃতির এক তরুণ। শিক্ষা জীবনের ইতি টেনে দীর্ঘদিন ধরে মাঝিড়া বন্দরে সুনামের সঙ্গে ফার্মেসি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। এলাকার ছোট ভাই হিসেবে ওকে আমি স্নেহ করতাম। দোকানে দেখা হলেই ওর আন্তরিক আতিথেয়তায় মুগ্ধ হতাম।
ঔষধ ব্যবসায়ী হলেও সমাজের নানা অসঙ্গতি, অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মারুফের ছিল প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। বন্ধু মহলেও ছিল বেশ জনপ্রিয়।
৫ আগস্টের পর শুনলাম, মারুফ ইসলামী সংগীত শিল্পী হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে। এরপর শুনলাম, সে জামায়াতের মতাদর্শের প্রচার করছে। রাজনীতি বরাবরই আমার অপছন্দের বিষয়। এ নিয়ে একদিন মারুফের সঙ্গে বেশ দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। ইসলামী দল হিসেবে জামায়াতের নানা গুণ-কীর্তন সেদিন আমার কাছে তুলে ধরেছিল সে।
এরপর মাঝখানে তেমন যোগাযোগ ছিল না।
হঠাৎ কয়েক মাস আগে শুনলাম, এক প্রতারকের খপ্পরে পড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা হারিয়েছে মারুফ। খবরটি শুনে সত্যিই খুব খারাপ লেগেছিল। একদিন ওর দোকানে গিয়ে দেখা করলাম। ঘটনার কথা বলতে গিয়ে বাচ্চা শিশুর মতো কেঁদে ফেলেছিল মারুফ।
আমি ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলাম—
“ভেঙে পড়ো না। জীবনে আমাদের অনেক সময় নানা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। বিপদে তিনিই সহায় হবেন।”
কয়েক দিন পর আবার দেখা। সেদিন মারুফকে বেশ হাসিখুশি মনে হলো। বলল,
“ভাই, আমার জন্য দোয়া করবেন। বাবার সহায়তায় আবার ভালোভাবে ব্যবসা শুরু করেছি। আর তেমন দেনা-পাওনাও নেই।”
কথাগুলো শুনে সত্যিই ভালো লেগেছিল। মনে হয়েছিল, জীবনের একটি কঠিন ধাক্কা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে ছেলেটি।
এরপরও বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে তেমন আলাপ হয়নি।
তারপর হঠাৎ ২৬ আগস্ট রাতে একটি ফোন।
ওপাশ থেকে একজন বলল—
“ভাই, শুনেছেন? মারুফ ৪৫ পিস ইয়াবাসহ ডিবির হাতে ধরা পড়েছে!”
প্রথমে কথাটা বিশ্বাস করতে পারিনি। মনে হচ্ছিল, নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। এরপর বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিলাম। জানতে পারলাম—ঘটনাটি সত্য।
একজন পরিচিত, হাসিখুশি, মানুষের সঙ্গে মিশুক সেই মারুফ—আজ মাদক মামলার আসামি!
জীবন কখন যে কোন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দেয়, আমরা কেউ জানি না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, সুসময়ে মারুফের পাশে থাকা অনেক বন্ধুকেই এখন আর দেখা যাচ্ছে না। কেউ দূরে সরে গেছে, কেউ আড়ালে-আবডালে সমালোচনায় মুখর। সমাজও যেন এক মুহূর্তেই তাকে ধিক্কার দিতে শুরু করেছে।
অভিযোগ সত্য হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু একজন মানুষকে শুধু তার পতনের মুহূর্ত দিয়ে বিচার করার আগে, তার জীবনের গল্পটাও কি আমাদের একবার ভাবা উচিত নয়?
মারুফের গল্পটি শুধু মারুফের গল্প নয়।
এটি আমাদের সমাজেরও একটি নির্মম বাস্তবতা।
আমাদের আশপাশে এমন কত ভালো ঘরের সন্তান, কত মেধাবী তরুণ, কত হাসিখুশি যুবক যে নেশার অন্ধকার জগতে পা বাড়াচ্ছে—তার হিসাব হয়তো আমাদের কারও কাছে নেই।
কেউ হয়তো প্রতারণায় সর্বস্ব হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। কেউ হতাশায় ডুবছে। কেউ ভুল মানুষের সঙ্গ নিচ্ছে। কেউ আবার ধীরে ধীরে এমন এক জগতে ঢুকে পড়ছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
কান পাতলেই শোনা যায়—নেশার ফাঁদে পড়ে কত তরুণের জীবন নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, স্বপ্নগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে, বাবা-মায়ের বুক খালি হয়ে যাচ্ছে।
আজ মারুফের দিকে আঙুল তুলছি আমরা। কাল সেই আঙুলটা যদি আমাদের নিজের ঘরের কোনো সন্তানের দিকে ওঠে?
তাই অপরাধের বিচার হোক—কঠোরভাবেই হোক। কিন্তু পাশাপাশি সমাজও ভাবুক, কেন আমাদের তরুণরা এই অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে?
একজন তরুণের পতনের গল্পের চেয়ে, তাকে পতনের আগেই ধরে ফেলার গল্প অনেক বেশি সুন্দর।
মারুফের জন্য এখন হয়তো অনেকেই শুধু নিন্দা করবে। কিন্তু আমি চাই—এই ঘটনা অন্তত আমাদের একটু ভাবাক।
মাদক শুধু একজন মারুফকে শেষ করে না; মাদক একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, একটি মায়ের স্বপ্নকে হত্যা করে, একটি বাবার বুক খালি করে দেয়, আর ধীরে ধীরে একটি সমাজের ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে।
আল্লাহ মারুফকে সঠিক পথে ফিরে আসার তৌফিক দিন। আর আমাদের সমাজের প্রতিটি তরুণকে মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে হেফাজত করুন।




