
“আমরা গরীব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। বাজারে গোস্তের যে দাম, তাতে কিনে খাওয়া যায় না…”—একগাল মুচকি হাসি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চোপিনগর গ্রামের দিনমজুর মো. সিকেন্দার আলী। সারা বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে ১০০ টাকা করে জমিয়ে অবশেষে পেয়েছেন প্রায় সাড়ে ৭ কেজি মাংস। ঈদে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সেই মাংস খাওয়ার আনন্দই যেন তার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
শুধু সিকেন্দার আলী নন, এমন গল্প এখন শাজাহানপুরের বহু গ্রামের। বাড়তে থাকা মাংসের দামে যখন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে গরুর মাংস, তখন ‘মাংস সমিতি’ হয়ে উঠেছে তাদের স্বস্তির ঠিকানা।
ফুলকোট গ্রামের এনজিও কর্মী জাকির হোসেন জানান, বাজারে যেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা, সেখানে সমিতির মাধ্যমে অনেক কম দামে মাংস পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, “সংসারের খরচ মিটিয়ে অনেকেই মাংস কিনে খেতে পারে না। তাই ৫৪ জনকে নিয়ে আমরা একটি মাংস সমিতি গড়েছি। সপ্তাহে ১০০ টাকা করে জমা দিয়ে সবাই সাড়ে ৭ কেজির মতো মাংস পেয়েছে।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শুধু দুবলাগাড়ী এলাকার ‘রিয়েল সোসাইটি’ নয়, উপজেলার মাঝিড়া, দুরুলিয়া, খলিশাকান্দি, বিব্লক, মাদলাসহ বিভিন্ন গ্রামেই একই চিত্র। কোথাও গরু জবাই হচ্ছে, কোথাও চলছে মাংস কাটাকাটি, আবার কোথাও ওজন করে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে সদস্যদের মাঝে। চারপাশে অপেক্ষমাণ মানুষের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক।
মাঝিড়া বন্দরের সিএনজি চালক গফুর শেখ বলেন, “দিনে ৬০০ টাকা আয় করে ৭৫০ টাকা দিয়ে মাংস কেনা সম্ভব না। তাই মাসে ৫০০ টাকা করে জমা দিতাম। এখন প্রায় ৮ কেজি মাংস পেয়েছি। ফ্রিজে রেখে কয়েক মাস খাওয়া যাবে।”
দুবলাগাড়ী বন্দরের ‘রিয়েল সোসাইটি’ মাংস সমিতির উদ্যোক্তা মো. মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন জানান, তিন বছর ধরে তিনি এ উদ্যোগ চালিয়ে আসছেন। এবার তার সমিতিতে সদস্য ৫৪ জন। মাসে ৪০০ টাকা করে জমা দিয়ে একটি ষাঁড় গরু কেনা হয়েছে। তিনি বলেন, “বাজারের তুলনায় প্রতি কেজিতে ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।”
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, শাজাহানপুরের প্রায় ২০০টি গ্রামে এ ধরনের মাংস সমিতি গড়ে উঠেছে। এসব সমিতির উদ্যোগে অন্তত ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকারও বেশি। সমিতিতে প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়েছে প্রায় ৬৬৫ থেকে ৬৭০ টাকা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগ শুধু সাশ্রয়ই নয়, বরং গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংহতির এক অনন্য উদাহরণ। বছরজুড়ে অল্প অল্প সঞ্চয়, আর ঈদের সময় সেই সঞ্চয়ের আনন্দ—‘মাংস সমিতি’ যেন গরিব মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক নিঃশব্দ বিপ্লব।




