১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

মাদক-পরকীয়ায় ভয়ংকর হয়ে উঠছে সমাজ

spot_img

মাদক, পরকীয়া, অনলাইন জুয়া ও মূল্যবোধের সংকটে ভয়ংকর হয়ে উঠছে সমাজ ।

মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:

দেশে দিন দিন বাড়ছে হত্যাকাণ্ড, পারিবারিক সহিংসতা ও নৃশংস অপরাধ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়—সামাজিক অবক্ষয় এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদকাসক্তি, অনলাইন জুয়া, পারিবারিক কলহ, পরকীয়া, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে এসব ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা।

গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া কয়েকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।
গত ৭ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে তালাবদ্ধ ঘর থেকে বর্ষা আক্তার (২০) নামে এক গার্মেন্টকর্মীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ৮ মে খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পারিবারিক কলহের জেরে কোদালের আঘাতে মাহিনুর আক্তার (২৪) নামে এক গৃহবধূকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
একই দিন চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামে এক যুবককে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ১১ বছর বয়সী শিশু রেশমি। সে এখনো হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

গত ৯ মে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় অপহরণের পর হত্যা করা হয় ৯ বছর বয়সী শিশু আন্দালিব সাদমান রাফিকে। পুলিশ জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার টাকার বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। অভিযুক্ত নূর মুহাম্মদ খোকনের বাড়ির স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাবের ভেতর থেকে বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করা হয়।
একই দিনে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় উদ্ধার করা হয় একই পরিবারের পাঁচজনের লাশ। নিহতরা হলেন শারমিন আক্তার (৩০), তার তিন সন্তান মীম খানম (১৫), উম্মে হাবিবা (৮), ফারিয়া (২) এবং রসুল মিয়া (২২)। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, আর্থিক লেনদেন, পরকীয়া ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে বিভিন্ন সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২২ জন। একই সময়ে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ২৯৪ নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৯ নারী ও শিশুকে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৭৭০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৫০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার পেছনে পরিকল্পিত হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত বিরোধ বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনে অশ্লীল ও পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের সহজলভ্যতা। এতে তরুণ সমাজের নৈতিকতা ও মানসিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি বিভিন্ন সিনেমা, ওয়েব সিরিজ, ওটিটি কনটেন্ট ও পারিবারিক কলহনির্ভর ধারাবাহিক নাটকের নেতিবাচক প্রভাবও সমাজে পড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
এ ছাড়া অনলাইন জুয়ার বিস্তার, ফেক আইডি ব্যবহার করে প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং দ্রুত অর্থবিত্তের মোহ তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে ফেলছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার চর্চা কমে যাওয়ায় সামাজিক মূল্যবোধে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধের দ্রুত বিচার ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গত মার্চ মাসের পরিসংখ্যানেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। ওই মাসে শুধু রাজধানীতেই খুনের ঘটনা ঘটেছে ২৪টি। ধর্ষণের অভিযোগ এসেছে ৫৬টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ৫৫টি এবং অপহরণের ঘটনা ২০টি। বিভিন্ন অপরাধে মোট মামলা হয়েছে এক হাজার ৩০৫টি।

সাম্প্রতিক সামাজিক অবক্ষয় ও অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক অবক্ষয় এখন শুধু পারিবারিক নয়, জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ