
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ১৯৮৩ সালের থানা কমপ্লেক্সের অধিগ্রহণ করা জমির মালিকানা নিয়ে স্থানীয় চৌকি আদালত এবং প্রশাসনের মধ্যে তৈরি হয়েছে আইনি সংঘাত। সেই সংঘাতের জেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে করা হয় ভায়োলেশন মামলা। শুধু তা-ই নয়, সেই মামলায় ইউএনওকে ছয় মাস আটক রাখার আবেদনও করা হয়।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইউএনও সাবরিনা শারমিনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার (সিভিল ভায়োলেশন) অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আদালতের অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ ইউএনওর হাতে পৌঁছানোর আগেই। গত ১৮ জুন জমি সংক্রান্ত বিষয়ে আদালত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নোটিশ জারির নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই আদেশ বিবাদীপক্ষের কাছে পৌঁছায় গত ৩০ জুন। অথচ ইউএনও গত ২১ জুন জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত ও উপজেলার বিশেষ সভার প্রেক্ষিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে সিরাজগঞ্জের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়ে চৌকি আদালতের সীমানা প্রাচীরের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখতে বলেন।
চৌকি আদালত ও উপজেলা প্রশাসনের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ১৪ জুলাই আদালতের সেরেস্তাদার ইউএনওর বিরুদ্ধে সিভিল ভায়োলেশন মামলা করেন। পরে ১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করেন।
আপত্তিতে তিনি অভিযোগ করেন, সরকারপক্ষকে শুনানির সুযোগ না দিয়েই অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং যথাযথভাবে নোটিশও সরবরাহ করা হয়নি। সেইসাথে উল্লেখ করেন, বাদী ও আদালত একই। কারণ বাদী মামলায় উল্লেখ করেছেন যে, বাদী/আদালত (বাদী অথবা আদালত)।
এই আপত্তিতে আদালত সম্পর্কে করা মন্তব্যকে অবমাননাকর উল্লেখ করে বিচারক গত ২৩ জুলাই আদেশে ইউএনওকে গত ২৬ জুলাই ব্যক্তিগতভাবে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এবং প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইউএনও সময়ের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করা হয়। একই সঙ্গে জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলা স্থানান্তরের আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিবাদী পক্ষের আবেদনও খারিজ করা হয়। সেইসাথে আদালত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে আদেশ দেন, ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার। এরপর গত ৩০ জুলাই বাদীপক্ষের একতরফা সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। তবে বর্তমানে চৌকি আদালতে মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চৌকি আদালতের গত ২৬ জুলাইয়ের আদেশ ইউএনও দপ্তর ২৮ জুলাই বিকেলে গ্রহণ করে। এর আগে, বিবাদী পক্ষ চৌকি আদালতে আবেদন করেও সেই আদেশের কপি পাননি।
তবে, গত ২৭ জুলাই সেই আদেশের বর্ণনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় এক ব্যক্তির ( চৌকি আদালত সংশ্লিষ্ট নন) কাছ থেকে আদেশের নথি নেয় উপজেলা প্রশাসন। অথচ ইউএনও আবেদন করেও ২৮ জুলাইয়ের আগে সেই নথি হাতে পাননি।
নথি অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক ইতোমধ্যে গত ১৬ জুলাই দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় মামলাটি জেলা জজ আদালতে স্থানান্তরের আবেদন করেন। ওই আবেদনের শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৬ আগস্ট। কিন্তু তার আগেই মূল আদালতে ভায়োলেশন মামলার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। তবে সরকারপক্ষ থেকে দেওয়ানি কার্যবিধির ২৪ ধারায় শুনানি করে মামলার নথি সিরাজগঞ্জ সদর কোর্টে স্থানান্তর করা হয়েছে।
উপজেলা পরিষদের সঙ্গে চৌকি আদালতের জমির মালিকানা নিয়ে চলা বিরোধ থেকেই তড়িঘড়ি করে ইউএনওর বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা করা হয় বলে অভিযোগ।
উপজেলা পরিষদের সম্পদের রেকর্ড অনুযায়ী, চৌকি আদালত বর্তমানে যে, ০.৬৫১২ একর জমি ব্যবহার করছে, সেটিও উপজেলা পরিষদের খতিয়ানভুক্ত এবং এর ভূমি উন্নয়ন কর এখনো উপজেলা পরিষদই পরিশোধ করছে। ১৯৮৩ সালের থানা কমপ্লেক্সের লে-আউট প্ল্যানেও চৌকি আদালতের জন্য প্রায় ০.৩৩৪২ একর জমি চিহ্নিত ছিল। অথচ আদালতের সংশোধিত আরজিতে প্রায় ৭.০৬ একর জমি আদালতের দখলে থাকার দাবি করা হয়।কিন্তু সরেজমিনে সেখানে উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন অফিস ও কোয়ার্টার আছে।
বাদীর আবেদনের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই, যা উপজেলা পরিষদের সম্পদ বিবরণীতে দেখা যায়।
গত ২৪ জুলাই শাহজাদপুর সিনিয়ন জজ আদালতের সেরেস্তাদার একটি আবেদন করেন।
সেই আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, শাহজাদপুর উপজেলা ৬ দশমিক ৬৩০০ জমি চৌকি আদালতের ভোগ দখলে রয়েছে। সেই জমিতে সরকারি বাজেটের আওতায় ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর থেকে সিরাজগঞ্জের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ কাজ করছে।
আবেদনে আরও দাবি করা হয়, প্রাচীর নির্মাণ কাজ পদাধিকার বলে ১ নম্বর বিবাদী (জেলা প্রশাসক) নির্দেশে ৩ নম্বর বিবাদী ইউএনও নিয়মবহির্ভূতভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করছেন। গত ২০ জুলাই ৩ নম্বর আসামি কাজ বন্ধ করার জন্য হুমকি দিয়ে চলে যান।
পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভায়োলেশন এর অভিযোগ তুলে সেরেস্তাদার আবেদনে বলেন, ইউএনও বা বিবাদীদের বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চান তিনি। যেন তারা আর কখনও সেখানে না আসতে পারেন। কারণ সেখানে উপজেলা পরিষদ আইসিটি ট্রেনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার ফর এডুকেশন নির্মাণের পরিকল্পনা করে জমি দখলের চেষ্টা করছে।
সেখানে তিনি আবেদন করেন, ১ ও ৩ নম্বর বিবাদীক কারণ দর্শানোর নোটিশসহ অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এই নোটিশের পর গত ১৮ জুন কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করে অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা আদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু এরপরেও বিবাদীরা ১৮ জুনের মধ্যে কোনো লিখিত আপত্তি দাখিল করেননি। ফলে ১৩ জুলাই লিখিত আপত্তি দাখিলের জন্য দিন ধার্য করেন আদালত।
এখানে আরও বলা হয়, আদালতের গত ২৪ মে কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করে অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা আদেশ বলবৎ রয়েছে।
বাদী আরও উল্লেখ করেন, গত ২২ জুন ঠিকাদারের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সীমানা প্রাচীর কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি ইউএনও গত ২১ জুলাই গণপূত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে একটি চিঠি দেন। সেই চিঠির প্রেক্ষিতে নির্মাণ কাজ বন্ধ রয়েছে। বলা হয়, ইউএনও সাবরিনা শারমিন নির্মাণ ক্ষমতার অপব্যবহার করে আদালতের আদেশ অমান্য করে
অস্থায়ী ও অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা আদেশ বলবৎ থাকা সত্বেও আদেশ না মেনে গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়ে নির্মাণ কাজ বন্ধ করেন। সেকারণে বাদী সেরেস্তাদার ইউএনওকে ছয় মাস আটক রাখতে আদালতে প্রার্থনা করেন। সেইসাথে ইউএনওর অর্থদণ্ডেরও আবেদন করা হয়।
১৯ জুলাই ইউএনও লিখিত আপত্তি দাখিল করেন। লিখিত আপত্তি গ্রহণ শুনানির জন্য নথি উপস্থাপন করা হয়।
বিচারকের আদেশ অনুযায়ী, ইউএনওর আপত্তিতে বলা হয়েছে বিচারককেই বাদী হিসেবে কটাক্ষ করে উল্লেখ করা হয়, শাহজাদপুর সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের সেরেস্তাদার মামলার বাদী হিসেবে মামলা করায় প্রকৃতপক্ষে বিচারক নিজেই বাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এছাড়া ইউএনওর স্বাক্ষরিত আপত্তিতে আরও বলা হয়েছে বিবাদীকে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ না দিয়ে অবহেলা ও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এছাড়াও বিবাদীকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় নোটিশ প্রদান না করে এই আদেশ প্রদান করেছেন।
বিচারক আরও বলেন, আদালত স্বপ্রণোদিতভাবে কোন আদেশ প্রদান করেননি। ইউএনওর আপত্তিতে আদালতের বৈধ আদেশকে উদ্দেশ্য প্রণোণিত ও যোগসাজসী আদেশ বলা হয়েছে।
ওই দিন আদালত আদেশ দেন যে, ২৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৯ টার ইউএনও নিজে হাজির হয়ে তার আপত্তির ব্যাখ্যা প্রদান করবেন৷ সেদিন আপত্তি বিষয়ক শুনানি হবে। যদি ইউএনও হাজির না হন, সেক্ষেত্রে আইনানুগ আদেশ প্রদান করা হবে। তবে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ও প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইউএনও সময়ের আবেদন করলে তা নামঞ্জুর করা হয়। তখন আদালত ইউএনওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার নির্দেশ দেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে।
এদিকে, চৌকি আদালতের সেরেস্তাদার মামলার আরজিতে দাবি করেন, উপজেলা পরিষদের গেজেটেড-নন গেজেটেড কোয়ার্টার তাদের দখলে রয়েছে।
উপজেলা পরিষদের সম্পদ বিবরণীর তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করে চৌকি আদালত পক্ষের আইনজীবি মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ইউএনওর বিরুদ্ধে ভায়োলেশন মামলা সঠিক প্রক্রিয়ার হয়েছে। এখানে তড়িঘড়ি করে কিছু করা হয়নি।
কিন্তু উপজেলা পরিষদের নথিতে রয়েছে, উপজেলা পরিষদের গেজেটেড-নন গেজেটেড কোয়ার্টার এবং ডরমেটরি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন।
শুধু নথিতেই নয়, সরেজমিনেও এমনটাই দেখা গেছে। বিদ্যুৎ,খাজনা,গ্যাস বিল উপজেলা পরিষদ পরিশোধ করছে।
উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান মনির জানান, তার অফিসসহ উপজেলা তথ্য আপার কার্যালয় সরিয়ে নিতে বলেছে উপজেলা কোর্ট ভবন। কোর্ট ভবন দাবি করছে, কোয়ার্টার -ডরমেটরি তাদের। আরজিতেও একই বিষয় বাদী উল্লেখ করেছেন।
ডরমেটরি রুমে বসবাস করা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মী বাবুল হাসান, সমাজসেবা অফিসের নৈশ প্রহরী লিটন হোসেন, বিআরডিবির মাঠকর্মী শাহাদত হোসেন জানান,
তারা ডরমেটরিতে বসবাস করে আসছেন। কিন্তু সম্প্রতি উপজেলা কোর্ট ভবনের কর্মচারীরা রুম ছেড়ে দেওয়ার জন্য তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ শুরু করেছেন।
উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাইফুল বারী ও একাডেমিক সুপারভাইজার মো. মিলন হোসেন জানান, তারা
কোয়ার্টার ভবনে পরিবারসহ বসবাস করেন। কোয়ার্টারগুলো উপজেলা পরিষদ দেখভাল করেন। তাদেরকেও ভবন ছেড়ে চলে যেতে বলেছে চৌকি আদালত।
সূত্র- ভিউজ বাংলাদেশ




