২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

ভিক্ষুকের হাত ধরে শুরু, আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থা—টিএমএসএসের অজানা ইতিহাস

spot_img

বগুড়ার সদর উপজেলার গোকুল ইউনিয়নের ঠেঙ্গামারা গ্রামের ছোট একটি সামাজিক উদ্যোগ থেকে দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা টিএমএসএস (TMSS)-এর যাত্রা শুরু। ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ’ দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়, নারীর ক্ষমতায়ন, ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বহুমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।

সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে স্থানীয় কয়েকজন অসহায় নারী ও ভিক্ষুককে নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে সংগঠনটি ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমান টিএমএসএসে রূপ নেয়। এই দীর্ঘ পথচলায় নেতৃত্ব দেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম।

সংস্থার ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠনের কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাদের ব্যবহৃত ঘরটি ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর কিছু সময় কার্যক্রম স্থবির থাকলেও ১৯৮০ সালে নতুন করে সংগঠন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ড. হোসনে আরা বেগম দায়িত্ব গ্রহণের সময় সংগঠনের সম্পদ হিসেবে ছিল একটি মাটির ঘর, কিছু নথিপত্র, ২৫টি ড্রাম, ২০৬ মণ চাল এবং ১২৬ জন সদস্য। পরে নিয়মিত সাপ্তাহিক সভা ও সদস্যভিত্তিক সঞ্চয় কার্যক্রম চালু করা হয়।

প্রথমদিকে সদস্যরা চাল জমা দিতেন। তবে চালের মান নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় নগদ সঞ্চয় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী প্রতি মঙ্গলবার সদস্যপ্রতি ২ টাকা করে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সংস্থার দাবি, এই ক্ষুদ্র সঞ্চয়ই পরবর্তীকালে তাদের আর্থিক ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৮২-৮৩ সালে সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় টিএমএসএসের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। ইউনিসেফের সহযোগিতায় স্যানিটেশন সামগ্রী উৎপাদন কর্মসূচি চালু করা হয়। সদস্যরা স্থানীয়ভাবে বালু, খোয়া ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করে রিং ও ল্যাট্রিন তৈরি এবং বাজারজাত করেন। এ কার্যক্রম থেকে সংগঠনের নিজস্ব মূলধনও গড়ে ওঠে।

ড. হোসনে আরা বেগম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে ১৯৭৯ সালে বগুড়া সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বাড়ার এক পর্যায়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে টিএমএসএসের পূর্ণকালীন নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে টিএমএসএস।

তবে ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে ড. হোসনে আরা বেগম বলেন, ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনায় মাঠপর্যায়ে ব্যাপক তদারকি, বাড়ি বাড়ি সেবা প্রদান এবং জামানতবিহীন ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়। তাঁর ভাষায়, টিএমএসএস শুধু ঋণ প্রদান নয়, সদস্যদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কাজ করে।

ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে সংস্থাটি ‘ডিউ কন্ট্রোল ডোমেইন (DCD)’ নামে নতুন একটি বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে বকেয়া ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

একটি ছোট গ্রামীণ উদ্যোগ থেকে শুরু করে টিএমএসএস বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, দীর্ঘ ৬২ বছরের এ পথচলায় প্রান্তিক মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নই তাদের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে কাজ করেছে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ