৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়: আবেগ নয়, চাই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত

spot_img

মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা শুধু একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিষয় নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই নানা আলোচনা, বিতর্ক ও মতভেদ দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে শাজাহানপুর উপজেলার জনগণের দাবি ছিল, উপজেলার জামালপুর এলাকায় বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। স্থানীয়দের মতে, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকা শাজাহানপুরে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে এলাকার সার্বিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। এ দাবির পক্ষে তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘোষণার বিষয়টিও উল্লেখ করে থাকেন।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানগড়–ভাসু বিহার মধ্যবর্তী অঞ্চলকে ঘিরেও শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাসবিদ, শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করেন, প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড় এবং প্রাচীন বাংলার অন্যতম উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র ভাসু বিহারের মধ্যবর্তী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হলে তা ইতিহাস ও আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য সমন্বয় সৃষ্টি করবে।

এ অঞ্চলের পক্ষে আরও যে বিষয়গুলো সামনে আসে, তার মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত ভূমি, দীর্ঘমেয়াদি সম্প্রসারণের সুযোগ, তুলনামূলক কম উন্নয়ন ব্যয় এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী পরিবেশ। প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, পর্যটন, কৃষি, খাদ্যপ্রযুক্তি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রেও এ অঞ্চল বিশেষ সম্ভাবনাময়।

অন্যদিকে শাজাহানপুরের পক্ষে যুক্তি হলো, উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক সংলগ্ন এ উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। তবে জাতীয় মহাসড়কের পাশে এত বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ফলে ভবিষ্যতে যানজট, নিরাপত্তা ও আন্দোলন-সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় জনপরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এ ধরনের দাবি-দাওয়ার সত্যতা যাচাই ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই নির্ভরশীল।

বাস্তবতা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, শিক্ষার প্রসার, গবেষণার সুযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় হওয়া উচিত।

তবে একই সঙ্গে এ কথাও অনস্বীকার্য যে, শাজাহানপুর শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নানা বঞ্চনার শিকার বলে স্থানীয়দের মধ্যে যে অনুভূতি রয়েছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। উন্নয়নের ভারসাম্য রক্ষায় পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় থাকা উচিত।

বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হবে, সেই সিদ্ধান্ত একদিন নেওয়া হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি যেন হয় তথ্যভিত্তিক, গবেষণানির্ভর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে—সেটিই আজ বগুড়াবাসীর প্রত্যাশা।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ