২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ভূমি অফিসে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘশ্বাস

spot_img

কিছুতেই ভূমি অফিস থেকে দুর্নীতির ভূত তাড়ানো যাচ্ছে না। ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি নানা উদ্যোগের মধ্যেই দেশের ভূমি অফিসগুলোয় প্রকাশ্যে চলছে দুর্নীতি-অনিয়মের রামরাজত্ব। দালাল চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ভূমিসেবা। নামজারি, খাজনা, জরিপ, মাঠ পর্চা ও রেকর্ড সংশোধনের মতো সাধারণ সেবা পেতে ঘুরতে হচ্ছে মাসের পর মাস।
অথচ নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলেই মিলছে দ্রুত সমাধান। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ভূমি অফিস ঘুরে নাগরিক হয়রানির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভূমি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালাল চক্র মিলে এমন এক অঘোষিত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে, যেখানে নিয়মের চেয়ে ‘লেনদেন’ই বড় হয়ে উঠেছে।

ফলে জমির বৈধ মালিকরাও নিজেদের জমির রেকর্ড, নামজারি কিংবা খাজনা-সংক্রান্ত কাজে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে পড়ছেন। রংপুরে একই জমি দুই পক্ষের নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মহানগরীর পার্বতীপুর মৌজায় জোরপূর্বক জমি দখলের ঘটনায় সাতগড়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া ওয়ারিশ তৈরি করে জমি দখলের চেষ্টা হয়েছে।এ ঘটনায় তদন্ত হলেও দীর্ঘদিনে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে।
এ ছাড়া সদর উপজেলার আলমনগর মৌজায় একই জমি দুই পক্ষকে নামজারি করে মালিকানা দেওয়ার অভিযোগে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও এখনো মেলেনি সমাধান। রংপুর জজ কোর্টের আইনজীবী ও মহানগর নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ডলাশ কান্তি নাগ বলেন, ভূমি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্নভাবে মানুষকে হয়রানি করছেন। ভূমি অফিসের দুর্নীতি এখন সাধারণ মানুষের জন্য বড় দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
মেহেরপুরে চলমান ভূমি জরিপ কার্যক্রমেও উঠেছে ভয়াবহ হয়রানির অভিযোগ। জমির মালিকদের অভিযোগ, সামান্য অসঙ্গতির অজুহাতে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখা হচ্ছে। কিন্তু দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে দ্রুত কাজ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। গাংনী উপজেলার বামুন্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভূমি কর্মকর্তার ঘুষ আদায়ের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, নামজারি, খাজনা ও দলিলসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য আবেদনকারীদের সরাসরি কর্মকর্তার কাছে না পাঠিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
যদিও মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেছেন, জেলার প্রতিটি ভূমি অফিসে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো বহিরাগত দালাল প্রবেশ করতে পারবে না। দালাল নির্মূলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

বগুড়ায়ও ডিজিটাল সার্ভে বা জরিপ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। জমির বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আবেদনকারীদের বারবার নতুন কাগজ জমা দিতে বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, টাকা না দিলে ফাইল আটকে রাখা, রেকর্ডে ভুল দেখানো কিংবা শুনানির নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অনেক জমির মালিক জানিয়েছেন, সিএস, এসএ, আরএস খতিয়ান, দলিল, নামজারি ও কর রসিদ ঠিক থাকার পরও কাগজকে ‘অসম্পূর্ণ’ বা ‘ভুল’ বলে হয়রানি করা হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে একজনের জমি আরেকজনের নামে রেকর্ড করার চেষ্টাও হচ্ছে।

সম্প্রতি বগুড়া মহানগরের মালগ্রাম এলাকার আবু সাঈদ হেলাল তার জমির খাজনা খারিজের জন্য সদরের ফাঁপোড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান। সেখানে তার কাগজপত্রে ভুল ধরা হয়। অনেক চেষ্টা করে কাগজপত্র ঠিক করে সদর ভূমি অফিসে পাঠানো হলে সেখানে আবার নতুন ভুল ধরা হয়। নানা কৌশলে জমির মালিকদের হয়রানি করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) কার্যক্রম নিয়ে মানুষের মধ্যে যেমন আশার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি বেড়েছে উদ্বেগও। অনেক জমির মালিক অভিযোগ করেছেন, জরিপের সময় কীভাবে জমির সীমানা নির্ধারণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তাদের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না। জমিতে যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরিমাপ করা হলেও মালিকদের সঙ্গে পরামর্শ করা হচ্ছে না। কিছু জানতে চাইলে অফিসে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভূমি জরিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে না হওয়ায় ভবিষ্যতে নতুন করে বিরোধ ও মামলা বাড়তে পারে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সঠিক তদারকি না থাকলে ডিজিটাল সার্ভেও দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠবে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে এবং অসঙ্গতি থাকলে তা সংশোধনের জন্য আবেদনকারীদের জানানো হয়।

ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাতগুলোর একটি ভূমি প্রশাসন। এ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি ভূমি নিয়ে সামাজিক সংঘাত ও মামলাও বাড়তে থাকবে। এমনিতেই ভূমি মামলায় দীর্ঘ জট। এক প্রজন্ম মামলা করে গেলে আরেক প্রজন্ম মামলার রায় পায়। ভূমি সার্ভেতে ভুল হলে এই জটিলতা আরও বাড়বে। এ ব্যাপারে সার্ভেয়াররা অনিয়মে জড়িত থাকলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি দমন, দালাল চক্র উচ্ছেদ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ