১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৪ঠা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২রা মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

সাজিনাস হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ, প্রাণ গেল নবজাতকের

spot_img

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় অবস্থিত সাজিনাস হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা, চিকিৎসকদের অবহেলা এবং দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে এক নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের পরিচালকসহ আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্সকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে ঘটনার তদন্তের জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) চট্টগ্রামের ৩য় মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আলমগীর হোসেনের আদালতে অভিযোগটি দায়ের করেন মৃত নবজাতকের মা আমাতুল মাকনুন। আদালত অভিযোগের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত সংগ্রহ করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাজিনাস হাসপাতালের পরিচালক হাসান মাহমুদ চৌধুরী, সহযোগী কনসালটেন্ট (এনআইসিইউ) ডা. আনোয়ার হোসেন, সিনিয়র কনসালটেন্ট (এনআইসিইউ) ডা. ফয়সাল আহমেদ, পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. আদনান ওয়ালিদ, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাস্কুলার সার্জন ডা. মো. মিনহাজুল হাসান, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. হাবিবুর রহমান, কার্ডিওথোরাসিক ও ভাস্কুলার সার্জন ডা. মো. ফজলে মারুফ এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জন ডা. মো. তামিম সাফায়েত চৌধুরী।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৫ মে নগরীর সার্জিস্কোপ হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন আমাতুল মাকনুন। জন্মের পর শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বায়েজিদ লিংক রোডের সাজিনাস হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ)-এ ভর্তি করা হয়। ভর্তির সময় শ্বাসকষ্ট ছাড়া শিশুটির শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০ মে শিশুটির বাম হাতে ব্যান্ডেজ দেখতে পান তার মা। এ বিষয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছে জানতে চাইলে বিষয়টিকে তেমন গুরুতর নয় বলে জানানো হয়। কিন্তু পরদিন শিশুটির বাম হাতের তালু কালো হয়ে যেতে দেখা যায় এবং আঙুলে গ্যাংগ্রিনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, চিকিৎসকদের অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার কারণে শিশুটির হাতে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে সংক্রমণ শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতির অবনতি হলে শিশুটিকে প্রথমে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা শিশুটির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অভিভাবকদের জানান, সাজিনাস হাসপাতালে ভুল স্থানে আইভি ক্যানুলা স্থাপন এবং পরবর্তী সময়ে ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে হাতের গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়ে হাতের টিস্যুতে পচন শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে জটিল সংক্রমণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে গত ৪ জুন এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বাদীপক্ষের আইনজীবী শুভাশীষ শর্মা সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। আদালত বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পথ সুগম হবে।

এদিকে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিশুটির মা আমাতুল মাকনুন নিজের ফেসবুক পোস্টে সন্তানের চিকিৎসাকালীন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিচার দাবি করেন। তার পোস্টটি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবার মান, জবাবদিহিতা ও রোগী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাজিনাস হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মতে, নবজাতকের মতো স্পর্শকাতর রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সামান্য ভুলও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তাই আদালতের নির্দেশে শুরু হওয়া তদন্তে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটিত হলে চিকিৎসা খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ