
বাংলাদেশের পলাতক প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতে আশ্রিত ফ্যা.সিস্ট হাসিনাকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারত। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত ফাঁসির রায় যাতে কার্যকর না হয়, সে জন্য বহুমূখী চেষ্টা তদবির চালাচ্ছে ভারতের বিজেপি সরকার।
ভারত হাসিনার বিরুদ্ধে ঘোষিত ফাঁসির রায়ের কার্যকারিতা ঠেকাতে সম্ভাব্য ৫টি পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ভারতের এই পঞ্চপথী ‘চাণক্যচেষ্টা’র কূটনৈতিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘পঞ্চতন্ত্র’।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন করে ত্রিমূখী চাপে পড়েছে ভারত। রায় ঘোষণার পরই নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জরুরি বৈঠক, কূটনৈতিক বার্তা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগও দ্রুত বেড়ে গেছে।
দক্ষিন এশিয়ায় ভারতের স্বার্থ রক্ষার সবচেয়ে বড় এজেন্ট শেখ হাসিনা। ভারতের শক্তি-সামর্থ এবং স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের অনেক স্পর্ষকাতর বিষয়ই নির্ভর করে বাংলাদেশের ওপর। আর ভারতের সেই ‘ভারি’ স্বার্থরক্ষার সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর শেখ হাসিনা। এ কারণেই নয়াদিল্লি চাচ্ছে, হাসিনার বিরুদ্ধে এই রায় যাতে কার্যকর না হয়, বা কমপক্ষে স্থগিত রাখা হয়।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জারি হওয়া ফাঁসির রায়ের কার্যকারিতা ঠেকাতে ত্রিমূখী চাপে পড়া ভারতের মোদী সরকারের এখন ত্রিশঙ্কু অবস্থা। একদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, অন্যদিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং আরেকদিকে ভারতের স্বার্থরক্ষার সবচেয়ে ঘনিষ্ট মিত্র, ভারতীয় মদদে বেড়ে ওঠা শেখ হাসিনাকে বাঁচানো।
সঙ্গত কারণে ভারত সরাসরি এই রায়ের বিরুদ্ধে বিবৃতি না দিলেও তলে তলে হাসিনাকে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব পথেই হাঁটা শুরু করেছে। মোদী সরকারের সংশ্লিষ্ট দফ্তরগুলোও সম্ভাব্য নানা পথের সন্ধানে তৎপর হয়ে উঠেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ না খুললেও নীরবভাবে যেসব পদক্ষেপ শুরু হয়েছে, তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র সচিব এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে নয়াদিল্লিতে টানা দু’দফা বৈঠক হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং শেখ হাসিনা ইস্যুতে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়।
ভারতের একজন শীর্ষ কূটনীতিকের মতে,“বাংলাদেশে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা শুধু একটি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে থাকবে না; বরং এটি সীমান্তজুড়ে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত বহুমুখী সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে।” যা ভারতের জন্য লজ্জার এবং চরম অবমাননাকর।
সূত্র মতে, ভারতের প্রথম লক্ষ্য হলো, রায়টি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার আওতায় নিয়ে আসা নিশ্চিত করা। এজন্য রায় ঘোষিত হওয়ার পরদিনই ভারতের একজন উচ্চপর্যায়ের কূটনীতিক ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। যদিও উভয় দেশই এটি কখনোই প্রকাশ্যে শিকার করবে না।
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে মূলত তিনটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
১. আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দ্রুত রায় কার্যকর না করা।
২. বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক যুক্ত করার সুযোগ রাখা।
৩. মানবিক ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রার্থনার প্রক্রিয়া খোলা রাখা।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনাকে বাঁচানোর জন্য ভারত ইতিমধ্যেই বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে । হাসিনাকে রক্ষায় এসব ভারতীয় তৎপরতা মোটা দাগে ৫টি পর্যায়ে শুরু হয়েছে।
প্রথমত : নীরব কূটনীতি
শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়ে বিরুদ্ধে যদিও দিল্লি প্রকাশ্যে কিছু বলেনি, তবে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের মাধ্যমে অঘোষিতভাবে কিছু রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় সম্পর্কে অবহিত করেছে।
হাসিনার বিরুেদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর ভারতের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত চায় এটি দ্বিপক্ষীয় ইস্যু হিসেবে দেখা না হোক, বরং আঞ্চলিক মানবাধিকার ও নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হোক।
ভারত সরাসরি বাংলাদেশের আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তাই দিল্লির এখনকার কৌশল মূলত আবেগ নয়, কূটনীতি। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিচারিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য কূটনীতির স্বীকৃত নিয়ম মেনেই ভারত সম্ভাব্য সব চেষ্টা করে যাবে।
দ্বিতীয়ত : পাওয়ার প্রেসার বিল্ডিং
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে ভারত যেসব পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
এক. ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা।
দুই. যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে “উদ্বেগ” জানানো।
তিন. জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা
চার. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উৎসাহ দেওয়া।
তৃতীয়ত : মানবাধিকার ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি
ভারতের কূটনীতিকরা বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন না, তবে বলছেন যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড মেনে ‘সর্বোচ্চ দণ্ড’ কার্যকরের আগে আরও পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন,“মৃত্যুদণ্ড বিশ্ব রাজনীতিতে ক্রমেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে। প্রতিবেশী হিসেবে ভারত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেই উদ্বেগ জানাতে পারে।”
চতুর্থত: সীমান্তে কড়া নজরদারি
রায় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে ভারতীয় সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে বিএসএফকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। ভারতের আশঙ্কা রয়েছে, বাংলাদেশে অস্থিরতা বাড়লে সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ দেখা দিতে পারে।
ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্ণেল রমেশ শর্মা (অব.) বলেন, “হাজার হাজার মানুষের হঠাৎ সীমান্তে ছুটে আসার ঘটনা ভারত কোনোভাবেই চাইবে না। এটি প্রতিরক্ষা, মানবিক সুরক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ সৃষ্টি করবে।”
পঞ্চমত: অর্থনৈতিক বার্তা
ভারতের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে রয়েছে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার চুক্তি।রেল ও সড়ক করিডোর সম্প্রসারণ। ভারত–বাংলাদেশ বিদ্যুৎ বিনিময় প্রকল্প এবং আসন্ন যৌথ উন্নয়ন তহবিল।
ভারত এসব প্রকল্প বাতিল করতে না চাইলেও ঢাকা যাতে পরিস্থিতি নরম করে আনে, সে জন্য ইঙ্গিতপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তাও পাঠাতে পারে।
ওপরের ৫টি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ ছাড়াও হাসিনাকে বাঁচাতে মধ্যপ্রাচ্যের মারপ্যাচকেও কাজে লাগাতে পারে ভারত। যেহেতু হাসিনাকে বাঁচানোর সম্ভাব্য সব পথেই হাঁটা শুরু করতে হবে, সে জন্য প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ভূমিকাও চাইতে পারে দিল্লি।
দিল্লির ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশগুলি কোনো হাসিনার ফাঁসির রায় কার্যকরের বিপরীতে আপস-সমাধান বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা পাইয়ে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও সৌদি আরবকে কাজে লাগাতেও চেষ্টা করতে পারে ভারত। এই তিন দেশের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্ক যেমনই হোক, মোদীর সম্পর্ক অনেক ভালো। ভারত সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে চাইতে পারে, এসব দেশ যেন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বার্তা পৌঁছায়।
ভারতের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো থেকে পরিষ্কার, দিল্লি শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকে শুধু একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না। বরং এটিকে আঞ্চলিক রাজনীতি, নিরাপত্তা, সীমান্ত স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছে।
শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় কার্যকরের বিষয়টি অনেক জটিল বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা নির্ভর করছে ঢাকার রাজনৈতিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তের ওপর। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনী ফলাফলের ওপর এই রায় কার্যকরের অনেক কিছুই নির্ভর করছে।
শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় বাংলাদেশের ভেতরকার জুডিশিয়াল ম্যাটার হলেও এর কূটনৈতিক প্রভাব এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়েই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই রায় কার্যকরের প্রভাবও তাই দক্ষিন এশিয়া জুড়েই বিস্তৃত হবে। এসব কারণেই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হচ্ছে ভারতকে।
লেখক: এফ শাহজাহান
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস
১৯ নভেম্বর ২০২৫




