
সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানিয়েছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দীর্ঘদিন অবহেলিত ও নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোকে। সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ অবকাঠামো, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।
জলাবদ্ধতা ও যানজট নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ
নগরবাসীর সবচেয়ে বড় দুটি ভোগান্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে জলাবদ্ধতা ও যানজটকে। এ সমস্যা সমাধানে প্রথম ধাপে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থা এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বনানী-মাটিডালি এলাকায় ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা নিরসন পরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হচ্ছে।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে থাকবে স্বেচ্ছাসেবক
শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার কারণে পথচারীদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। সাতমাথা, বনানী, চারমাথা, নবাববাড়ি সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে ফুটপাত ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে, শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, দখলমুক্ত অবস্থান ধরে রাখতেও নেওয়া হচ্ছে নতুন কৌশল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, উচ্ছেদ অভিযানের পর ৫০ থেকে ১০০ জন ইউনিফর্মধারী স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে পুনরায় দখল ঠেকাতে কাজ করবেন। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিচালিত হবে এই কার্যক্রম।
যানজট কমাতে চালু হতে পারে ওয়ানওয়ে সড়ক
বগুড়া শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হওয়ায় নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থার কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ। ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ওয়ানওয়ে ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ ট্রাফিক ম্যাপ প্রস্তুত করা হচ্ছে। বনানী-মাটিডালি করিডোর, কাঁঠালতলা এলাকা এবং অন্যান্য ব্যস্ত সড়কগুলোকে প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনার আওতায় রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মহাসড়ক থেকে শহরে প্রবেশকারী যানবাহনের চাপ কমাতে বিকল্প রুট ব্যবহারের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
লাইসেন্সের আওতায় আসবে অটোরিকশা
শহরে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা চলাচলকে যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে প্রশাসন। বর্তমানে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা কোনো নির্দিষ্ট নিবন্ধন বা রুট ছাড়াই চলাচল করছে।
এ অবস্থার পরিবর্তনে সব অটোরিকশা ও রিকশাকে লাইসেন্সের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ এবং যানবাহনের নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স নিশ্চিত করার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অবৈধ পার্কিং নিয়ন্ত্রণে নতুন ব্যবস্থা
রাস্তার পাশে দীর্ঘ সময় ধরে যানবাহন পার্কিং করাও নগরীর যানজটের বড় কারণ। এ সমস্যা সমাধানে নির্ধারিত পার্কিং জোন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উত্তরা সিনেমা হলসংলগ্ন এলাকাসহ কয়েকটি সম্ভাব্য স্থানে পার্কিং সুবিধা তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, বিপণিবিতান ও বড় ভবনগুলোকে নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। ভবিষ্যতে নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
১০০ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আসবে শহর
নগর নিরাপত্তা জোরদার, অপরাধ দমন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে বনানী থেকে মাটিডালি পর্যন্ত প্রায় ১১ কিলোমিটার এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরবর্তীতে সাতমাথা, চারমাথা, রেলগেট, পুলিশ প্লাজা মোড়, শেরপুর রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে যানজট, অবৈধ পার্কিং, সড়ক দখল ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ
সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের চাপ অনেক বেড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় যানবাহন ও অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে পুরো শহরের বর্জ্য অপসারণে মাত্র দুটি ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
এ সমস্যা সমাধানে নতুন ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজাপুর ও গাবতলী-বাগবাড়ী সড়কের লিচুতলা এলাকায় সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ডাম্প ট্রাক সংগ্রহ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ চলছে।
ডিজিটাল হবে নাগরিক সেবা
নাগরিকদের হয়রানি কমাতে সিটি কর্পোরেশনের অধিকাংশ সেবা অনলাইনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ, পানির বিল দেওয়া, জন্ম ও নাগরিকত্ব সনদের আবেদনসহ বিভিন্ন সেবা ঘরে বসেই গ্রহণ করা যাবে।
মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিল ও কর পরিশোধের সুযোগও চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
জনবল ও অবকাঠামো ঘাটতি কাটানোর পরিকল্পনা
বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সাবেক পৌরসভার জনবল দিয়ে। প্রয়োজনের তুলনায় কর্মীসংখ্যা কম হওয়ায় মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান জনবলকে কাজে লাগিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে সিটি কর্পোরেশনকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বনানীর চারমাথা এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর স্থায়ী প্রধান কার্যালয় নির্মাণের প্রস্তাবও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রশাসনের আশা, পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বগুড়া একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও নাগরিকবান্ধব নগরীতে রূপ নেবে। বিশেষ করে অবহেলিত ও নতুন অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে নগরবাসীর জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে।




