তবে শুক্রবার বিকেলে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেইজিং ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সাথে থাকা এই শক্তিশালী ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দলের ঝুলি আসলে কতটা ভরেছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।

অ্যাপেল, মেটা, বোয়িং, কারগিল এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কোম্পানির শীর্ষ কর্তাদের এই সফরে উপস্থিতিই প্রমাণ করে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে যতই টানাপোড়েন থাকুক না কেন, মার্কিন কর্পোরেটদের কাছে চীনা বাজারের গুরুত্ব অপরিসীম।বিশেষ করে বাণিজ্য যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা যখন চরমে, তখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে নিজেদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে এবং নীতিগত জটিলতাগুলো সরাসরি বুঝতে চীনা নীতিনির্ধারকদের সাথে মুখোমুখি বসা এই নির্বাহীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।

US CEO 01বেইজিংয়ের গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং মার্কিন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের মধ্যকার বৈঠকে যোগ দিতে এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এবং অ্যাপলের সিইও টিম কুক উপস্থিত হয়েছেন ছবি: সংগৃহীত
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বেইজিং সফরের সাথে এই সফরের একটি বড় অমিল রয়েছে। সেবার বিশাল এক প্রধান নির্বাহী দল ট্রাম্পের সাথে ছিল এবং প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। কিন্তু এবারের সফরের মূল লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক চুক্তির চেয়েও রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং এক ধরনের পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা।

বেইজিং-ভিত্তিক কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হুতং রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা ফেং চুচেং বলেন, বেইজিং কখনোই এই ধরণের শীর্ষ সম্মেলনকে শুধুই লাভ-ক্ষতির বা লেনদেনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। তাই চুক্তির আকার দিয়ে এই সম্মেলনের সাফল্য পরিমাপ করা ঠিক হবে না। চীনের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা, যাতে দুই দেশের সম্পর্ক আচমকা অনিয়ন্ত্রিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার দিকে মোড় না নেয়।

বাণিজ্যিক দিক থেকে এই সফরের একমাত্র দৃশ্যমান অর্জন হলো ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার একটি চুক্তি, যা ট্রাম্প নিজেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন (যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো বাকি)। তবে এটি বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। কারণ বাজার যেখানে ৫০০টি বিমানের আশা করছিল, সেখানে এই সংখ্যাটি ২০১৭ সালের সফরের (৩০০টি বিমান) চেয়েও কম।

অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় নিরাশা এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের জন্য। আমেরিকার অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও এনভিডিয়ার শক্তিশালী এআই চিপ ‘এইচ২০০’ চীনের কাছে বিক্রির অনুমতি মেলার ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং, যাকে ট্রাম্প শেষ মুহূর্তে আলাস্কা থেকে নিজের বিমানে তুলে নিয়েছিলেন এই আশায় যে চিপ জট খুলবে, তিনি এই চুক্তি নিয়ে কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। রয়টার্সের বারবার করা প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু হেসে বলেন, আমি চীনকে ভালোবাসি, এখানে চমৎকার সময় কেটেছে। শুক্রবার বেইজিংয়ের রাস্তায় ঘুরে, গান শুনে এবং স্থানীয় বারে আড্ডা দিয়েই সময় পার করেছেন এই প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ার।

 টেসলার ইলন মাস্ক থেকে শুরু করে এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, সবাই সশরীরে হাজির ছিলেন ট্রাম্পের চীন সফরে ছবি: সংগৃহীত
আপাতদৃষ্টিতে এই সম্মেলনটি বাস্তব অর্জনের চেয়েও ‘ইতিবাচক পরিবেশ’ তৈরির জন্য বেশি সফল ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে মার্কিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দ্য এশিয়া গ্রুপের সাংহাই পরিচালক হ্যান শেন লিন একটি বড় ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, বেইজিং যদি ট্রাম্পকে দেশে ফেরার জন্য পর্যাপ্ত ‘ব্যবসায়িক জয়’ বা বড় চুক্তি উপহার না দেয়, তবে ট্রাম্প হতাশ হয়ে তাঁর প্রশাসনের কট্টর চীন-বিরোধীদের হাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের রাশ ছেড়ে দিতে পারেন। আর তেমনটা হলে দুই দেশের সম্পর্ক নিশ্চিতভাবেই আবারও সংঘাত ও চরম উত্তেজনার পথে হাঁটবে।

অবশ্য অনেক মার্কিন নির্বাহী ট্রাম্পের প্রস্থানের পরও চীনে থেকে গেছেন এবং চীনা কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে আগামী দিনগুলোতে নতুন কোনো চুক্তির ঘোষণা এলেও আসতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স