৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩রা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৬ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

শাজাহানপুরে মব আতঙ্কে ১০ মাস ঘরছাড়া ১৩ পরিবার!

spot_img

রাধিকা রহমান:

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার খরনা ইউনিয়নের ভাদাইকান্দি গ্রামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ‘মব’ আতঙ্কে প্রায় ১০ মাস ধরে ঘরছাড়া ১৩টি পরিবারের অন্তত ৬০ সদস্য। নিজ বাড়িঘরে ফিরতে না পেরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ এসব পরিবারের সদস্যরা গত ঈদুল আজহাও নিজ ভিটেমাটিতে উদযাপন করতে পারেননি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় জাহিদ হাসান ওরফে জার্জিস (৩৮) এবং তার নেতৃত্বাধীন একটি কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ে তারা এলাকায় ফিরতে পারছেন না। প্রশাসনের কাছে জানমালের নিরাপত্তা এবং হামলা-লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ট্রাকচালক আবুল খায়েরকে মারধর করে তার ডান হাত ও পা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে সুস্থ হওয়ার পর ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই আবুল খায়ের ও আল আমিনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত আল আমিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ আগস্ট মারা যান।
নিহত আল আমিন স্থানীয় জাহিদ হাসান জার্জিসের ভাতিজা। এ ঘটনায় জার্জিস বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলায় ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন—এমন কয়েকজনকেও ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে আসামি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আল আমিনের মৃত্যুর পর প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়। এমনকি গোয়ালের গরু-ছাগল পর্যন্ত নিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এসব ঘটনায় আদালতে পৃথক তিনটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে।
কৃষক আব্দুল আজিজ (৬০) বলেন, ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তবুও আমার বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়েছে। প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভয়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে থাকায় ৯ বিঘা জমি চাষ করতে পারছি না।
গ্রামের প্রবীণ কৃষক আলহাজ নুরুল ইসলাম (৭৮) বলেন, জার্জিসের সঙ্গে আমার জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। আল আমিনের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ভয়ে এখনও বাড়ি ফিরতে পারছি না। আমার ৪০ বিঘা জমি অনাবাদী পড়ে আছে।
গৃহবধূ হাসনা হেনা (২৬) জানান, তিন সন্তানকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত অবস্থায় দিন কাটছে। হামলার সময় পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। তিনি বলেন, আমার সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাই।
একই গ্রামের দাখিল পরীক্ষার্থী আম্বিয়া খাতুন বলেন, “কোনো অপরাধ না করেও আমরা মবের শিকার। অন্যের বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দিচ্ছি। আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, গরু পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছে। এভাবে বেঁচে থাকা খুব কষ্টের।
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে জাহিদ হাসান জার্জিস বলেন, “কেন ভাঙচুর হয়েছে, তা গ্রামে এসে খোঁজ নিয়ে বিচার করুন। ফোনে এসব বলা সম্ভব নয়।”
এ বিষয়ে শাজাহানপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আব্দুর রহিম বলেন, “২০২৫ সালের ২ আগস্ট ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি কয়েকটি বাড়িতে ইতোমধ্যে ভাঙচুর করা হয়েছে। আতঙ্কিত নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে আমরাও মব পরিস্থিতির মুখে পড়ি।
শাজাহানপুর থানার ওসি আশিক ইকবাল বলেন, পুলিশের পক্ষে বাড়িতে বাড়িতে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। তবে মব সৃষ্টি করে কেউ পার পাবে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ