
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের পতন ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পূর্ববর্তী টানা ১৫ বছর দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ও ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দিবসটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি ছুটি বাতিল করে। ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন বন্ধ থাকে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকার ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে এবারও দিনটিতে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকছে না।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেদিন ভোরবেলা ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের নিজ বাসভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শাহাদাতবরণ করেন তাঁর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব, তিন ছেলে– মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল, সেনা কর্মকর্তা শেখ জামাল ও ১০ বছরের শিশু শেখ রাসেল এবং দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল প্রমুখ। তবে প্রবাসে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
কর্মসূচি নেই আওয়ামী লীগের
আগের ১৫ বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালন করা হতো ‘শোকাবহ আগস্ট’। কিন্তু সরকার পতনের পর কার্যত ছিন্ন-ভিন্ন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আজ শনিবার আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে আজ রাতে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা করার কথা জানানো হয়েছে। এতে ভারতে অবস্থানরত দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন। এ ছাড়া ফেসবুকে কেউ কেউ বারবার আক্রমণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ এবং বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘোষণা দিচ্ছেন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধেও কোনো কর্মসূচি পালনের সুযোগ পাচ্ছেন না দলীয় নেতাকর্মীরা। গণঅভ্যুত্থানের বছর ২০২৪ সালেও সেখানে গোপালগঞ্জ জেলা ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ব্যানারে স্বল্প পরিসরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও দোয়া-মোনাজাতের কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল। তবে ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সে নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের ঢোকার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বর্তমানে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধের প্রধান ফটকসহ ভেতরে পুলিশের কঠোর পাহারা বসানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষ এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এই অবস্থায় কমপ্লেক্সটির ভেতরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মা সায়েরা খাতুনের সমাধি জরাজীর্ণ রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে, রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় এই চত্বরে অবস্থিত মসজিদ, লাইব্রেরি, গবেষণা কেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, উন্মুক্ত মঞ্চ, ফুলের বাগানসহ গোটা এলাকা অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরে উঠেছে।
পলাতক পাঁচ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনা আরও অনিশ্চিত
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আত্মস্বীকৃত পাঁচ খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার চেষ্টা করলেও তাদের ফেরত আনতে পারবে না, এটাই বাস্তবতা।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সেই পলাতক পাঁচ আসামি হলেন– লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী, মেজর (বরখাস্ত) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) খন্দকার আবদুর রশিদ, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) এ এম রাশেদ চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। তাদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্য তিনজনের অবস্থান জানা নেই।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ১২ আসামির মধ্যে পাঁচজনের সাজা কার্যকর করা হয়। তারা হলেন– সাবেক মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (বরখাস্ত) ফারুক রহমান, কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, এ কে এম মহিউদ্দিন (ল্যান্সার) ও লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি)। আরেক আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদের ফাঁসি ২০২০ সালের ১১ এপ্রিল কার্যকর করা হয়। ওই বছর ৭ এপ্রিল ঢাকার গাবতলী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে তিনি প্রায় দুই যুগ ভারতে আত্মগোপন করেছিলেন। আরেক পলাতক আসামির মৃত্যু হয় বিদেশে।
নূর ও ডালিমসহ পাঁচ পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেও সফল হয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। এদিকে গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী এখন দেশছাড়া। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ নেবে না বিএনপি সরকার।
তাছাড়া, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যেসব দেশে আত্মগোপন করে আছেন, সেসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তিশালী বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকা বড় বাধা। অনেক পশ্চিমা দেশ মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করে না। বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফিরিয়ে আনতে চাইলে সেই দেশগুলো আইনি জটিলতা বা মানবাধিকারের প্রশ্ন তোলে। অন্যদিকে, পলাতক আসামিরা আশ্রয় নেওয়া দেশের আদালতে আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে রেখেছেন। পাশাপাশি যেসব দেশে পলাতকরা আইনি মর্যাদায় বসবাস করছেন, তাদের অবস্থান হালনাগাদ করাও কঠিন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, রাজনৈতিক চিন্তা করলে সরকারের নীতি এক ধরনের হবে, আর আইনের শাসনের কথা চিন্তা করলে, বাংলাদেশে যাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব।




