৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

আদমদীঘিতে বর্জ্য পরিশোধনাগার ছাড়াই চালকল, দূষিত খাল-ফসলি জমি!

spot_img

আদমদীঘি (বগুড়া) প্রতিনিধি: বগুড়ার আদমদীঘির সান্তাহারে পরিবেশগত নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) ছাড়াই অটোমেটিক চালকল পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। এসব মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত তরল বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে প্রবাহিত হচ্ছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। এতে দূষিত হচ্ছে জলাশয় ও হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি জমিজমা। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে এসব দণ্ডনীয় অপরাধ থাকা সত্বেও মানছে না মিলাররা এবং পদক্ষেপের জন্য তৎপরতা নেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও।

জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষি ও মাছচাষের ওপর নির্ভরশীল। তবে বিভিন্ন কলকারখানার বিষাক্ত ধোঁয়া ও অপরিশোধিত তরল বর্জ্যে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি ও জলজ পরিবেশ। বিশেষ করে সান্তাহার এলাকায় কয়েকটি অটোরাইস মিলের বর্জ্য সরাসরি খাল ও ফসলি জমিতে গিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বুশরা অটো রাইস মিল, সুন্দরী অটো রাইস মিল, ইছামতী, ফুলজান, সালমান, এমবি, বৈশাখীসহ প্রায় ১৪টি অটোরাইস মিলের সিদ্ধ ও ধোয়া সেকশন থেকে নির্গত ক্ষতিকর ও দুর্গন্ধযুক্ত তরল বর্জ্য সরাসরি খাল, জলাশয় ও ফসলি জমিতে ফেলা হচ্ছে। নীতিমালায় বাঁধা নিষেধ থাকলেও আদৌও তা
মানা হচ্ছেনা। শুধু তাই নয় অটোরাইস মিলে বর্জ্য পানি পরিশোধনের জন্য ইটিপি (Effluent Treatment Plant) তরল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা বাধ্যতামূলক হওয়া সত্বেও দৃশ্যমান নেই। দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব খাটিয়ে অবাধে এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন মিল মালিকরা। অথচ এসব অপরিশোধিত বিষাক্ত পানি সরাসরি প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে’ গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ জেল জরিমানা বিধান রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো কাগজে-কলমে নিয়মভঙ্গের কথা থাকলেও বাস্তবে এর কার্যকর দেখা যায়নি বলে জানান সচেতন এলাকাবাসী। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাদের এমন নিরবতায় জনমনে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বুশরা অটো রাইস মিলের বর্জ্য পানি রেলের জায়গা দিয়ে ফসলি জমির পাশ দিয়ে ইরামতি খালে পড়ছে। অন্যদিকে এমবি এগ্রো ফুডস ও সালমান অটো রাইস মিলের বর্জ্য পানি ড্রেনের মাধ্যমে ফসলি জমি পেরিয়ে সরাসরি খাড়িতে যাচ্ছে। এছাড়াও অন্যান্য চালকলে চলছে একই নিয়মে। একইভাবে বিভিন্ন চালকলের অপরিশোধিত বর্জ্য পানি খাল-জলাশয়ে পড়ায় দূষিত হচ্ছে পানি ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আবাদি জমি ও জলজ পরিবেশ। এদিকে মিলের বর্জ্য পানি ও খালের পানির নমুনা সংগ্রহ করে সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারে পরীক্ষা নীরিক্ষা দেখা যায়, দ্রবীভূত অক্সিজেন (DO) এর স্বাভাবিক মাত্রা প্রতি লিটারে ৩ থেকে ৬ মিলিগ্রাম থাকার কথা থাকলেও মিলের পানিতে তা পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৪ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে ১ দশমিক ২ মিলিগ্রাম। পানির পিএইচ (pH) এর স্বাভাবিক মাত্রা ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ দশমিক ৫ হওয়ার কথা। পরীক্ষায় মিলের পানিতে পিএইচ পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৩ এবং খালের পানিতে ৬ দশমিক ৮। অ্যামোনিয়ার স্বাভাবিক মাত্রা ০ দশমিক ০৫ থেকে ০ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও মিলের পানিতে এর পরিমাণ ১০ মিলিগ্রামের বেশি এবং খালের পানিতে ১২ মিলিগ্রামের বেশি পাওয়া গেছে বলে পরীক্ষার তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অ্যালকালিনিটির স্বাভাবিক মাত্রা ২০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম থাকার কথা থাকলেও মিলের পানিতে তা পাওয়া গেছে মাত্র ০ দশমিক ৩ মিলিগ্রাম এবং খালের পানিতে শূন্য।

এ বিষয়ে স্থানীয় কৃষক লতিফুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খাড়ির দুর্গন্ধে এখন আশপাশে যাওয়া যায় না। জমিতে ফলন কমেছে, পচা পানিতে মাছও বাঁচে না। একসময় খালের মাছেই পরিবারের আমিষের চাহিদা মিটত এখন মাছ কিনে খাওয়াও কঠিন।

বুশরা অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী হাফেজ
বেলাল হোসেন বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানের পেছনের একটি পুকুরে বর্জ্যপানি ফেলা হয়। তবে ড্রেনের মাধ্যমে খালে গিয়ে যে পানি পড়ে তা পরিষ্কার বলে দাবী করেন। বাঁকি মিল মালিকরাও একই সুরে কথা বলেন।

সান্তাহার নাগরিক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক এম এস রোশদানী বলেন, খাল বিলের মাছগুলো ছিলো অত্যন্ত সুস্বাদু। কলকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্যপানিতে ইরামতি খালের পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে ভরাট ও কচুরিপানায় খালটি এখন প্রায় মৃতপ্রায়। তিনি বর্জ্যপানি ফেলা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানান।

সান্তাহার মৎস্য গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিশির কুমার দে বলেন, নমুনা পরীক্ষায় মিল ও ইরামতি খালের পানি প্রকৃতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। নমুনায় ছাই ও ধাতব উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে। হেভি মেটাল পরীক্ষা হলে ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মাহমুদুল হাসানের জানান, উল্লেখ করা ছয়টি মিলের মধ্যে বুশরা অটো রাইস মিলের ছাড়পত্র নবায়ন রয়েছে। তবে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত ও দূষিত তরল বর্জ্য ড্রেন দিয়ে সরাসরি খাল,জলাশয় ও ফসলি জমিতে পড়ছে এ বিষয়ে জিজ্ঞেসা করতেই তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ