
নেপালের নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির নেতা বালেন্দ্র (বালেন) শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই এক ঐতিহাসিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
রোববার (২৯ মার্চ) অনুষ্ঠিত প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে একটি উচ্চাভিলাষী ১০০ দফার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। এই পরিকল্পনায় তিনি দেশটির শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্টের বরাতে সংবাদমাধ্যম ফার্স্ট পোস্ট রোববার (২৯ মার্চ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই নেপালের রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক করতে ১০০ দফার এক বিশাল পরিকল্পনা উন্মোচন করেছে বালেন্দ্র শাহের সরকার। যার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিক্ষা খাত।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ নেপালের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে সরাসরি হুমকি দিয়ে ঘোষণা করেছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো থেকে সকল প্রকার রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করা হবে। এগুলোর পরিবর্তে গঠন করা হবে সম্পূর্ণ নির্দলীয় ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’। মূলত একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমিয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া বা দলীয় আনুগত্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জনসেবা খাতে বিদ্যমান দলীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোও বিলুপ্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার করে তোলার সংকল্প ব্যক্ত করেছেন শাহ।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে বালেন্দ্র শাহ সরকার ঘোষণা করেছেন, একটি বিশেষ কমিটি ১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সকল রাজনীতিবিদ এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আর্থিক সম্পদের উৎস তদন্ত করবে। সন্দেহজনক লেনদেন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রিয়েল-টাইমে নজরদারি করতে একটি ডিজিটাল রেজিস্ট্রি তৈরি করা হবে। পাশাপাশি তথ্যদাতাদের (হুইসেলব্লোয়ার) সুরক্ষায় বিশেষ কাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রশাসনের ব্যয় কমাতে এবং কর্মদক্ষতা বাড়াতে বর্তমানে বিদ্যমান ফেডারেল মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা ৩০ দিনের মধ্যে কমিয়ে ১৭-তে নামিয়ে আনা হবে। অকেজো বোর্ড ও কমিটিগুলো বিলুপ্ত বা একীভূত করা হবে এবং প্রতিটি সরকারি পদের জন্য নির্দিষ্ট ‘কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর’ (কেপিআই) নির্ধারণের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
রাষ্ট্রীয় সেবা আধুনিকীকরণে ডিজিটাল রূপান্তরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রই (এনআইডি) হবে সব সরকারি সেবা পাওয়ার প্রধান চাবিকাঠি। পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং নাগরিকত্ব সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো ‘ফেসলেস’ বা সরাসরি সাক্ষাৎহীন ডিজিটাল পদ্ধতিতে দেওয়া হবে, যাতে দুর্নীতির কোনো সুযোগ না থাকে।
এই সংস্কার পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক উদ্বেগের বিষয়টিও স্থান পেয়েছে। এতে মাত্র দুই দিনের মধ্যে স্টার্টআপ নিবন্ধন এবং বড় বিনিয়োগ প্রকল্পের জন্য ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ অনুমোদন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন এবং গণপরিবহন নিরাপত্তাকে এই এজেন্ডার মূল বৈশিষ্ট্য হিসেবে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের কার্যালয় থেকে সরাসরি এই সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি তদারকি করা হবে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জবাবদিহি করতে হবে।
নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতা গত দুই বছরের অস্থিরতা এবং তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উত্থানের ফসল। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে নেপালি কংগ্রেস এবং সিপিএন-ইউএমএল এর মতো প্রথাগত দলগুলো জোট সরকার গঠন করলেও দুর্নীতির অভিযোগ এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই সুযোগে কাঠমান্ডুর মেয়র এবং স্বাধীন ধারার রাজনীতির আদর্শিক নেতা বালেন্দ্র শাহ তার দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা এবং ‘সুশাসনের’ প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তোলেন, যা গত নির্বাচনের ফলাফলে প্রথাগত বড় দলগুলোকে হটিয়ে দিয়ে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের সূচনা করে।
ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৬-এর নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে। রোববার (২৯ মার্চ) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা এবং ১৯৯১ সাল থেকে রাজনৈতিক নেতাদের সম্পদের তদন্ত করার মতো ১০০ দফার এক আমূল সংস্কার পরিকল্পনা উন্মোচন করেন। মূলত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে আধুনিকায়ন করার সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে নেপালের রাজনীতিতে কয়েক দশকের ‘পুরানো জমানা’র অবসান ঘটিয়ে এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা।




