২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৩ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

‘প্রতারক’ থেকে ‘মহান বন্ধু’ চীন নিয়ে যেভাবে সুর বদলালেন ট্রাম্প

spot_img

গত বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) শি জিনপিং ওয়াশিংটনে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানাতে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে যান ট্রাম্প। ১৯৬২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানকে স্বাগত জানানোর পর বিদেশি কোনো নেতাকে এভাবে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা এটি প্রথম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শির সফর ঘিরে ওয়াশিংটনে ছিল আনুষ্ঠানিকতা ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। এ সময় ট্রাম্পের বক্তব্যেও ছিল প্রশংসার সুর। তবে চীন ও শি জিনপিংকে নিয়ে ট্রাম্পের অতীতের বক্তব্য ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

চীনকে ‘প্রতারক’ বলেছিলেন ট্রাম্প

২০১২ সালের আগস্টে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প চীনকে অলিম্পিকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও দেশটির বিরুদ্ধে মিথ্যা বলা, প্রতারণা ও চুরির মতো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি।

২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রচারে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কৌশলী হওয়ার কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। একই সময়ে চীনা নেতাদের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে আপ্যায়নের সমালোচনা করে তিনি আলোচনার টেবিলে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

নিজের ‘ক্রিপল্ড আমেরিকা: হাউ টু মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বইয়েও ট্রাম্প চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ ছিল, কম মজুরির শ্রমিক ব্যবহারের মাধ্যমে চীন মার্কিন শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি করেছে। একইসঙ্গে মার্কিন ব্যবসায় গুপ্তচরবৃত্তি, প্রযুক্তি চুরি এবং মুদ্রার মূল্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও করেছিলেন তিনি।

২০১৬ সালে ইন্ডিয়ানার এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘লুটে নেওয়ার’ অভিযোগ তোলেন। ২০২০ সালে তিনি দাবি করেন, চীন যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করেছে, তেমনটি আর কোনো দেশ করেনি।

দ্বিতীয় মেয়াদে বদলেছে বক্তব্য

তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চীন নিয়ে বক্তব্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হওয়ার সময়ও ট্রাম্প বলেন, তিনি চীনকে দোষ দিচ্ছেন না এবং শি জিনপিংকে তিনি পছন্দ করেন।

শির এবারের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় সেই ইতিবাচক সুর আরও স্পষ্ট হয়। ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টকে ‘মহান ভদ্রলোক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে ‘খুব ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক’ এবং দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সত্যিকারের মহান বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

১১ বছরের মধ্যে এটি কোনো চীনা নেতার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প ও শির এটি তৃতীয় মুখোমুখি বৈঠক। তবে উষ্ণ বক্তব্যের মধ্যেও দুই দেশের মধ্যে এআই, বিরল খনিজ, তাইওয়ান ও ইরানসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

বাণিজ্যযুদ্ধের চাপ

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে চীনও মার্কিন পণ্যে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেয়। একপর্যায়ে দুই দেশই একে অপরের পণ্যের ওপর প্রায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পথে এগিয়েছিল। পরে আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে এসব পদক্ষেপ স্থগিত করা হয়।

এর মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাই সময়ে দেশটির পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা বেড়ে প্রায় ৩২৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়, যা আগের বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালে চীনের মোট পণ্য রপ্তানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত চীনের পণ্য বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৮২০ বিলিয়ন ডলার।

বিরল খনিজে চীনের প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যিক টানাপোড়েনে বিরল খনিজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন, যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরিতে এসব খনিজের ব্যবহার রয়েছে।

বিশ্বে পরিচিত বিরল খনিজের প্রায় ৬০ শতাংশের মজুত চীনে রয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী এসব খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাত করে দেশটি। বাণিজ্যযুদ্ধের সময় চীন ১২ ধরনের বিরল খনিজের মধ্যে সাতটির রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। আরও পাঁচটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

বৈঠকে বড় সমঝোতা না হলেও বাণিজ্যবিরতি বাড়ল

শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকে বড় কোনো সমঝোতা না হলেও বিদ্যমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৃহত্তর বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় পাচ্ছেন। নতুন বাণিজ্যবিরতি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

তবে ইরান ইস্যুতে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব কাজে লাগানোর প্রত্যাশা ছিল ট্রাম্পের।

তাইওয়ান ইস্যুতেও দুই দেশের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার পাশাপাশি বিষয়টি সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর পাশাপাশি দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের আরও অবনতি ঠেকানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। শি প্রতিযোগিতাকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখার আহ্বান জানান এবং দুই পরাশক্তির সংঘাতের ঝুঁকি বোঝাতে ‘থুসিডাইডিস ট্র্যাপ’-এর প্রসঙ্গ তোলেন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ বা যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির বিষয় আলোচনা হয়েছে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ