
মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:
গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস আর উৎসবের আবহে মুখর হয়ে উঠেছিল বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার টেংগামাগুর এলাকা। হাজারো ভক্তের প্রণাম, পূজা-অর্চণা, মানসা ও পাঠাবলীর মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার (১২ মে) অনুষ্ঠিত হচ্ছে প্রায় দেড়শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী শীতলা বুড়িমাতা পূজা ও টেংগামাগুর মেলা।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, শীতলা বুড়িমাতার প্রতিমায় পূজা-অর্চণা ও মানসা দিলে রোগ-ব্যাধি, বিপদ-আপদ থেকে মুক্তি মেলে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সেই বিশ্বাসকে ধারণ করেই বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার প্রতি বছর এই পূজার আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে বসে প্রাণচঞ্চল টেংগামাগুর মেলা।
সোমবার (১১ মে) বিকাল থেকেই মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় বসতে শুরু করে মেলার দোকানপাট। লিচু, আম, তরমুজ, বাঙ্গি, জামরুলসহ গ্রীষ্মকালীন ফলের পসরা ছিল মেলার অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি শিশুদের জন্য নানা ধরনের খেলনা, নাগরদোলা ও বিভিন্ন রাইডে ছিল উপচেপড়া ভিড়।
শুধু শিশুরাই নয়, অনেক মধ্যবয়সী মানুষও নাগরদোলায় চড়ে যেন ফিরে গেছেন শৈশবের দিনগুলোতে। গ্রামীণ এই মেলায় কাঠের আসবাবপত্র, লোহার সামগ্রী, বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্রও কিনতে দেখা যায় দর্শনার্থীদের।
স্থানীয়দের কাছে টেংগামাগুর মেলা এখন শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং একটি সামাজিক ও পারিবারিক উৎসব। মেলাকে ঘিরে এলাকার প্রতিটি বাড়িতে ছিল উৎসবের আমেজ। আত্মীয়-স্বজনের আগমনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।
শাজাহানপুর, শেরপুর, নন্দীগ্রাম ও কাহালু উপজেলা থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার ভক্ত শীতলা বুড়িমাতা মন্দিরে সমবেত হন। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটানা চলে পূজা-অর্চণা ও ভক্তি নিবেদন। মানসা হিসেবে ভক্তরা নিয়ে আসেন কবুতর, দুধ, কলা, সন্দেশ, আম, লিচু, তরমুজ ও বাঙ্গিসহ নানা উপকরণ। বিকালে অনুষ্ঠিত হয় পাঠাবলী।
বুড়িমাতা পূজার পুরোহিত ভরত চন্দ্র গোস্বামী জানান, তিনি গত ৩০ বছর ধরে এই পূজার দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তার বাবা ও দাদাও একই দায়িত্ব পালন করেছেন।
শীতলা বুড়িমাতা পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা জানান, প্রায় দেড়শ’ বছর আগে পূর্বপুরুষরা এই পূজার সূচনা করেন। বর্তমানে শাজাহানপুরের আট পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ একত্রিত হয়ে ‘শীতলা বুড়িমাতা পূজা উদযাপন কমিটি’ গঠন করেছেন। প্রতিবছর বৈশাখের শেষ মঙ্গলবার তারা ঐতিহ্যবাহী এই পূজা ও মেলার আয়োজন করে আসছেন।
ধর্মীয় বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হওয়া টেংগামাগুরের শীতলা বুড়িমাতা পূজা ও মেলা আজও বহন করে চলেছে বাংলার চিরায়ত সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন।




