
বগুড়া শহরে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ বিরোধ ও ব্যক্তিগত রেষারেষিকে কেন্দ্র করে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠেছে। শহরজুড়ে সক্রিয় অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। একের পর এক ছুরিকাঘাত ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
গত ৩১ মে রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন তরুণ ফটোগ্রাফার ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ। অভিযোগ, মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন কিশোর তাকে নিজ বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হলে প্রাণে বেঁচে গেলেও এখনও সেই হামলার ক্ষত বহন করছেন তিনি।
ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ বলেন, “আমি এখনও জানি না আমার অপরাধ কী ছিল। কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে কষ্ট হয়।”
এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও হামলার ১০ দিন পরও জড়িতদের গ্রেপ্তার না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
স্নিগ্ধের মতো ভাগ্যবান ছিল না স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম। গত ১৭ এপ্রিল শহরের শাকপালা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে কিশোর গ্যাংয়ের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় সে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি তার দিনমজুর মা।
তিনি বলেন, “আমার ছেলেটাকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু বিচার চাই, যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।”
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া শহরে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
গত বছরের ২৬ জুলাই শহরের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ৮১০টি বার্মিজ ও চায়নিজ চাকু উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। এরপরও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, গডফাদারদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বগুড়ায় ৪৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ৩৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১০০ জন।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোস্তফা কামাল সরকার বলেন, কিশোর গ্যাং এখন সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বগুড়া জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল বাছেদ বলেন, অপরাধ দমনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পেলে কিশোরদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতাও কমবে।
জেলা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইনচার্জ ইকবাল বাহার বলেন, শহরের একাধিক কিশোর গ্যাংকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতোয়ার রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না। সূত্র: চ্যানেল টেন




