২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

স্বাধীনতার দীর্ঘশ্বাস, ক্ষমতার উত্তরাধিকার, রাষ্ট্রের বন্দিত্ব ও নাগরিকের পরাজয়

spot_img

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

 

স্বাধীনতার ৫৪ বছর—সময়টি সংখ্যায় দীর্ঘ, কিন্তু অর্জনের বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ। এই অর্ধশতকের বেশি সময়ে আমরা যে রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গেছি, তা এক নির্মম সত্য সামনে এনে দাঁড় করায়,আমরা শাসক বদলেছি, ক্ষমতার পতাকা বদলেছি, কিন্তু রাষ্ট্রের দালান চিন্তা, কাঠামো ও চরিত্র প্রায় অপরিবর্তিত রেখেছি। স্বাধীনতার নামে যে রাষ্ট্র গড়ে ওঠার কথা ছিল নাগরিকের মর্যাদা, ন্যায় ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে, তা ক্রমে পরিণত হয়েছে ক্ষমতার উত্তরাধিকার রক্ষার যন্ত্রে।

মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক দর্শন ছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব। কিন্তু বাস্তবে সেই সার্বভৌমত্ব ধীরে ধীরে সরে গেছে কাগজের পাতায়, সংবিধানের ভূমিকায় এবং স্মারক বক্তৃতার অলংকারে। রাষ্ট্রের কার্যকর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে অল্প কিছু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গোষ্ঠীর হাতে যাদের কাছে জনগণ আর ক্ষমতার উৎস নয়, বরং শাসনের উপকরণ। ফলে স্বাধীনতা রাষ্ট্রের সম্পত্তি হয়েছে, নাগরিকের অধিকার হয়নি।

ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বারবার, কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে অনুত্তরিত, ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে শাসকের চরিত্র কি একই থাকে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় থাকে না। বিরোধী অবস্থানে থাকাকালে যে ভাষা ন্যায় ও অধিকারের পক্ষে উচ্চারিত হয়, ক্ষমতায় গিয়ে সেই ভাষাই নীরব হয়ে পড়ে। ক্ষমতা এখানে চরিত্র যাচাইয়ের মানদণ্ড নয়, বরং চরিত্রকে গ্রাস করার এক নিষ্ঠুর প্রক্রিয়া। তাই শাসক বদলায়, শাসন বদলায় না, সরকার বদলায়, রাষ্ট্র বদলায় না।

এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান সবচেয়ে করুণ। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবই কাগজে স্বাধীন, কিন্তু কার্যত রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় বন্দী। আইনের শাসন এখানে নীতিগত আদর্শ নয়, বরং নির্বাচনী প্রয়োগের কৌশল। যার ফলে নাগরিকের কাছে রাষ্ট্র আর ন্যায়বিচারের আশ্রয় নয়, বরং অনিশ্চয়তার উৎস।

স্বাধীনতার আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো আমরা উন্নয়নকে অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছি, কিন্তু রাষ্ট্রীয় নৈতিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। সেতু, সড়ক, ভবন হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো শক্ত হয়নি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বেড়েছে, কিন্তু বৈষম্যের কাঠামো ভাঙেনি। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু নাগরিক নিরাপদ হয়নি। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় ভয়হীন নাগরিক জীবন, তবে আমাদের স্বাধীনতা আজও অসম্পূর্ণ।

সবচেয়ে গভীর সংকটটি রাষ্ট্রচিন্তায়। এখানে রাষ্ট্র মানে শাসকের ক্ষমতা রক্ষা, নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা নয়। মতপ্রকাশ শর্তসাপেক্ষ, ভিন্নমত ঝুঁকিপূর্ণ, আর সমালোচনা প্রায়শই রাষ্ট্রদ্রোহের ছায়ায় দাঁড় করানো হয়। ফলে একটি ভীত-সন্ত্রস্ত সমাজ গড়ে ওঠে, যেখানে নাগরিকরা স্বাধীনতার অধিকার নয়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খোঁজে।

৫৪ বছরে এসে প্রশ্নটি তাই আরও ধারালো হয়ে ওঠে আমরা কি সত্যিই স্বাধীন হতে পেরেছি? নাকি কেবল একটি শাসনব্যবস্থা থেকে আরেকটিতে রূপান্তর ঘটিয়েছি, যেখানে জনগণ বরাবরই দর্শক? স্বাধীনতা যদি নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত না হয়, তবে তা রাষ্ট্রীয় উৎসবের অলংকার ছাড়া আর কিছু নয়।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ক্ষমতার সংস্কার নয়, বরং রাষ্ট্রবোধের পুনর্গঠন। যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের সেবা-কাঠামো, শাসকের ক্ষমতা-দালান নয়, যেখানে ক্ষমতা হবে জবাবদিহির অধীন, প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব নয়, এবং যেখানে স্বাধীনতা থাকবে জীবনের বাস্তবতায়, স্মৃতির মঞ্চে নয়।

ইতিহাস নির্মম সে সময়ের হিসাব নেয়। যদি আমরা স্বাধীনতার নামে কেবল ক্ষমতার ধারাবাহিকতাকেই বৈধতা দিই, তবে ভবিষ্যৎ আমাদের ক্ষমা করবে না। স্বাধীনতার প্রকৃত মানে ফিরিয়ে আনতে হলে আজই রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফেরত দিতে হবে এটাই ৫৪ বছরের সবচেয়ে জরুরি দাবি।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ