২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আদালতের নিষেধাজ্ঞায় এবার হচ্ছে না ঐতিহ্যবাহী ‘পোড়াদহ মেলা’

spot_img

শেষ বুধবার বা ফাল্গুনের প্রথম বুধবারের জন্য বছরজুড়ে অপেক্ষা করে ইছামতী নদীর তীরবর্তী পোড়াদহ গ্রাম। এই সময় নদীপাড়ে বাজে উৎসবের সুর, নামে মানুষের ঢল। শুধু একটি গ্রাম নয়—পুরো বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলা যেন রঙিন হয়ে ওঠে পোড়াদহ মেলাকে ঘিরে, যা স্থানীয়ভাবে ‘জামাই মেলা’ নামেও পরিচিত।

কিন্তু এবার আর দেখা যাবে না সেই চিরচেনা দৃশ্য। থমকে গেছে শতবর্ষী ঐতিহ্যের স্রোত। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগের দিন পড়েছে মাঘের শেষ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি)। এ কারণেই চলতি বছর ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা স্থগিত করা হয়েছে। এরপর ফাল্গুনের প্রথম বুধবারেও মেলা আয়োজন করা যাচ্ছে না। কারণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৫৯ সালের আদালতের একটি পুরনো রায়।
পোড়াদহ মেলার আয়োজকদের (জমির মালিক) একজন গাবতলী উপজেলার মহিষাবান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ মণ্ডল জানান, ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মেলার আয়োজকদের মামলা হয়। আদালতের রায়ে বলা হয়—মাঘের শেষ বুধবার অথবা ফাল্গুনের প্রথম বুধবারের মধ্যেই পোড়াদহ মেলা আয়োজন করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে মেলার খাজনা সরকার গ্রহণ করবে এবং মেলাটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলে যাবে।
তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী যদি মাঘ মাসের শেষ বুধবার ২৫ তারিখে পড়ে, তাহলে ফাল্গুনের প্রথম বুধবার মেলা হয়। আর যদি ২৬ তারিখ বা তার পরে পড়ে, তাহলে মাঘের শেষ বুধবারেই মেলা করতে হয়। এবার মাঘের শেষ বুধবার পড়েছে ২৮ তারিখে। সে অনুযায়ী ওই দিনই মেলা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওই দিন জাতীয় নির্বাচনের আগের দিন হওয়ায় মেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি।

আব্দুল মজিদ মণ্ডল আরো জানান, পোড়াদহ মেলার পরদিন অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’। তবে নির্বাচনের কারণে এই দুই দিন সব ধরনের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, যানবাহনও চলবে না। মানুষ ভোট নিয়ে ব্যস্ত থাকবে নাকি মেলা করবে—এই দ্বিধা থেকেই মেলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদালতের রায় অনুযায়ী পরে মেলা আয়োজনের সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।

পোড়াদহ মেলার ইতিহাস শুধু উৎসব নয়—এটি কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য। প্রায় ৪০০ বছর আগে গাবতলীর পোড়াদহ গ্রামে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে গ্রামের একটি বটগাছের নিচে গড়ে ওঠে আশ্রম। সেখানে শুরু হয় পূজা, আর সেই পূজাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে পোড়াদহ মেলার সূচনা।
জানা যায়, প্রায় আড়াই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে নিয়মিতভাবে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। মেলাকে কেন্দ্র করে জামাইরা শ্বশুরবাড়িতে আসেন, বাড়ি বাড়ি চলে আপ্যায়ন। পরদিন নারীদের জন্য আলাদা আনন্দের আয়োজন—‘বউ মেলা’।

পোড়াদহ মেলা মানেই ইছামতীর তীরে কেনাকাটা, গল্প আর হাসির মিলনমেলা। তবে এবার সেই গল্প নেই। থাকবে না মানুষের ভিড়, বাজবে না উৎসবের সুর। আদালতের এক পুরনো রায়ে থমকে গেল শতবর্ষী এই ঐতিহ্য।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ