
বগুড়া জেলা পুলিশের ভ্রমণ ভাতা (টিএ) বিল জালিয়াতির ঘটনায় সাবেক ও বর্তমান প্রায় ৩০ পুলিশ সদস্যের নাম তদন্তে এসেছে। এরই মধ্যে ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে তদন্ত কমিটি। প্রাথমিকভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে তিন কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থ আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ সুপারের কম্পিউটার আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করার ঘটনা ধরা পড়ার পর বিষয়টি সামনে আসে। গত ১৯ আগস্ট সকালে দাপ্তরিক কাজের সময় পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ তাঁর কম্পিউটার আইডিতে অস্বাভাবিকতা দেখতে পান। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাঁর আইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন পুলিশ সদস্যের নামে টিএ বিল তৈরি করে হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে বগুড়া পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রাজিবুল ইসলাম ও জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের অডিটর ফিরোজ আলমের নাম আসে। পরে জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ছয় সদস্যের ব্যাংক হিসাব যাচাই করে অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আসাদুজ্জামানকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ১ সেপ্টেম্বর তদন্ত শুরু করে কমিটি। ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০ পুলিশ সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাবি করেন, তাঁদের ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার পর তা তুলে ফিরোজ আলম ও রাজিবুল ইসলামের হাতে দিতে হয়েছে। তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত ফিরোজ আলম বা রাজিবুল ইসলামের ব্যাংক হিসাবে এসব অর্থ জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। টাকা কার হিসাবে জমা হয়েছে, কে উত্তোলন করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত অর্থ কোথায় গেছে—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, অডিটর ফিরোজ আলমের সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই পরিচয় ছিল। তাঁর ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার পর তা তুলে ফিরোজ আলমকে দেওয়ার কথা জানান তিনি। এর বিনিময়ে সামান্য কিছু টাকা পেয়েছেন বলেও দাবি করেন ওই সদস্য।
জালিয়াতির প্রকৃত পরিধি জানতে বগুড়া জেলা পুলিশের দুই হাজারের বেশি সদস্যের টিএ বিল যাচাই করা হচ্ছে। পুরোনো বিল, বরাদ্দ, হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে পাঠানো কাগজপত্র, টিএ বিল রেজিস্টার ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
বগুড়ার পুলিশ সুপার মীর্জা সায়েম মাহমুদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সদস্যরা টিএ বিল পাচ্ছিলেন না। অথচ এ খাতে বরাদ্দ আসার পর তা শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় অনুসন্ধান করা হয়। পরে তাঁর আইডি অন্য কেউ ব্যবহার করার ঘটনা ধরা পড়ে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বগুড়ার ঘটনা পুলিশ সদর দপ্তরকে জানানোর পর দেশের অন্যান্য জেলাতেও এ ধরনের জালিয়াতি হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
বগুড়া জেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আছাদুজ্জামান সরকার জানান, অভিযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর অডিটর ফিরোজ আলমকে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রধান কার্যালয় থেকে চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার মামুন উল মান্নানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও বগুড়ায় এসে তদন্ত করে গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঘটনাটি কয়েকটি ভুয়া বিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে আরও বেশি সংখ্যক পুলিশ সদস্য এবং বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত জড়িত ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা ও আত্মসাৎ করা অর্থের চূড়ান্ত পরিমাণ নিশ্চিত নয়। বর্তমানে তিন কোটি টাকার বেশি সরকারি অর্থের হিসাব মিলছে না এবং প্রায় ৩০ পুলিশ সদস্যের নাম তদন্তে এসেছে।
সূত্র: গণেশ দাশ, সাংবাদিক




