২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৮শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৪ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

ডলার সংকটে স্থবির আমদানি-রপ্তানি, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয় ও মুল্যস্ফীতির চাপ

spot_img

দেশে চলমান ডলার সংকটের কারণে আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে মারাত্মক স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির ফলে ব্যাংকগুলো সময়মতো এলসি (Letter of Credit) খুলতে পারছে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন এবং ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামের ওপর।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধি গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এক সময় যেখানে রিজার্ভ ছিল ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি, সেখানে বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ২০–২৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। রিজার্ভ কমে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার সরবরাহে কড়াকড়ি আরোপ করেছে এবং আমদানিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক নীতি অনুসরণ করছে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সীমিত ডলার সরবরাহের কারণে অনেক ব্যাংক এলসি খোলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করছে। এতে আমদানিকারকদের ডলার পেতে অতিরিক্ত সময় লাগছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে একই পরিমাণ পণ্য আমদানিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

ডলার সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে আমদানি নির্ভর শিল্প খাতে। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয়, সেখানে কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা দেখা দিয়েছে। শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, কাপড়, সুতা, রাসায়নিক দ্রব্য ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিলম্ব হওয়ায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। কোথাও কোথাও উৎপাদন ২০–৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ওষুধ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও একই ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে। আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশের ওপর নির্ভরশীল এসব শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডলার সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

রপ্তানি খাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রপ্তানিকারকেরা জানান, সময়মতো কাঁচামাল আমদানি করতে না পারায় আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি আদেশ বাতিল বা স্থানান্তরিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা ডলার সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

অন্যদিকে আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চাল, ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির মতো পণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে আমদানি ব্যয় ও ডলার সংকট অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ডলার সংকটের পেছনে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, রপ্তানি আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়া, অতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতা, প্রবাসী আয়ের আনুষ্ঠানিক প্রবাহে ধীরগতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা বড় ভূমিকা রাখছে। তারা সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও মন্থর হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় বৃদ্ধি ও প্রবাসী আয় আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে আনতে প্রণোদনার কথাও জানানো হয়েছে।

তবে ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ডলার সংকট নিরসনে দ্রুত, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সহায়তা জরুরি, যাতে আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

লেখক: রুমিনা খাতুন

শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ