৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৮ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

অযত্ন-অবহেলায় ধুঁকছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত “সোন্দাবাড়ী মাদরাসা

spot_img

মো: আব্দুল হান্নান:
‎বগুড়ার গাবতলী উপজেলার “সোন্দাবাড়ী মাদরাসা” মুসলিম রেনেসাঁ এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় নাম। এই গ্রামেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে ১৭০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক ‘সোন্দাবাড়ী মাদরাসা’। দীর্ঘ ৩১৭ বছরের ইতিহাস বুকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজও উত্তরবঙ্গে ইসলামী শিক্ষা, আকিদা সংস্কার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের আলোকবর্তিকা হয়ে টিকে আছে। তবে তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠে।

‎​ব্রিটিশবিরোধী জিহাদ আন্দোলনের দুর্গ ​সোন্দাবাড়ী মাদরাসা কেবল কিতাব পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মুজাহিদদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব তাঁর বিখ্যাত ‘দাওয়াত ও জিহাদ’ গ্রন্থে এই কেন্দ্রের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।”​তৎকালীন সময়ে এই কেন্দ্র থেকেই শহীদ ফকির মাহমুদসহ অসংখ্য মুজাহিদ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। মাদরাসার পাশেই অবস্থিত ‘মুজাহিদ কবরস্থান’ আজও সেই ত্যাগের নীরব সাক্ষী। সেখানে নয়জন বীর মুজাহিদের সমাধি রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, অসমাপ্ত মুজাহিদ কেন্দ্রের আমীর নেয়ামতুল্লাহর (১৯১৫-১৯২১ খ্রি.) দেহরক্ষী বেলাল গাজীও এই সোন্দাবাড়ী থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। বেলাল গাজী ছিলেন শাজাহানপুর উপজেলার কাঁটাবাড়ীয়া গ্রামের বীর সন্তান।

‎​ব্রিটিশ পরবর্তী সময়ে উত্তরবঙ্গে বিশুদ্ধ আকিদা ও সুন্নাহর প্রসারে এই মাদরাসার অবদান অনস্বীকার্য। মাওলানা আব্দুস সাত্তার (রহ.)-এর মতো প্রখ্যাত আলেমগণ এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই তাঁদের দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এক সময় নিখিল বঙ্গ ও আসাম আহলেহাদীস কনফারেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সভার মূল ভিত্তি ছিল এই সোন্দাবাড়ী মাদরাসা।

‎​প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন ছাত্র ক্বারী আব্দুল মান্নান স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, ​”আমি ১৯৬৮-৭১ সালে এখানে পড়ালেখা করেছি। ব্রিটিশ আমলে এটি ছিল প্রায় ২০০ মসজিদ এবং অসংখ্য মাদরাসার মারকায বা কেন্দ্র।” ​অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহাসিক এই সম্পদ ​গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকলেও বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয়দের আক্ষেপ, তিন শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও অবকাঠামোগত বা শিক্ষা ক্ষেত্রে আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি। বর্তমানে মাত্র ৫০ জন হেফজ বিভাগের ছাত্র নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে এর কার্যক্রম।
‎​
‎ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, সোন্দাবাড়ী মাদরাসা কেবল বগুড়ার নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের মুসলিম ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে এই প্রাচীন বিদ্যাপীঠের স্থাপত্য ও স্মৃতিগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা জরুরি। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টিই পারে উত্তরবঙ্গের এই ঐতিহাসিক রত্নকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ