
মো. আব্দুল হান্নান
পবিত্র ঈদুল আজহার দিনে বগুড়ার সাতমাথা এলাকায় বসেছে কোরবানির গোশত বিক্রির এক ভ্রাম্যমাণ হাট। দুপুর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত এখানে চলছে গোশত কেনাবেচার ধুম। মূলত কসাই, পেশাদার ভিক্ষুক এবং সমাজের সাধারণ দরিদ্র মানুষ—যারা বিভিন্ন বাড়ি থেকে কোরবানির গোশত সংগ্রহ করেছেন—তারাই এখানে গোশত বিক্রি করতে আসছেন। আর এই হাটের ক্রেতা মূলত মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ, যারা আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিজেরা কোরবানি দিতে পারেননি।
সাধারণ ও অসহায় মানুষের এই কেনাবেচাকে কেন্দ্র করেও গড়ে উঠেছে এক অসাধু সিন্ডিকেট। একদল সংঘবদ্ধ চক্র মাঠ পর্যায়ে অসহায় মানুষদের কাছ থেকে মাত্র ৬৫০ টাকা কেজি দরে গোশত কিনে নিচ্ছে। এরপর মুহূর্তের মধ্যেই তা সাধারণ ক্রেতাদের কাছে ৭০০, ৮০০ এমনকি ৮৫০ টাকা পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি করছে। উৎসবের দিনেও এমন নির্মম মুনাফাখোরি দেখে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে—”মানুষের বিবেক আজ কোথায়?”
কোরবানির গোশত, হাড় ও পারিশ্রমিক সংক্রান্ত ইসলামিক বিধান কি?
কোরবানির পশুর গোশত বণ্টন, চামড়া এবং কসাই বা কাজের লোকের পারিশ্রমিক নিয়ে ইসলামে সুনির্দিষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা রয়েছে।
১. কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত দেওয়া নিষেধ। কোরবানির পশুর কোনো অংশই কসাই বা শ্রমিককে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নেই। আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) বলেন, “নবী (সা.) আমাকে তাঁর (কোরবানির উটের) আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে বলেছিলেন। তিনি কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় সদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজের পক্ষ থেকে দেব।’” (বুখারি: ১ / ২৩২)
কোরবানি জবাই বা কাটাকুটির জন্য কসাইকে নগদ টাকা বা অন্য কোনো উপায়ে নিজের পকেট থেকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। তবে হ্যাঁ, কসাই যদি দরিদ্র হয়, তবে পারিশ্রমিক চুকিয়ে দেওয়ার পর তাকে সাধারণ গরিব মানুষের মতো উপহার বা সদকা হিসেবে গোশত দেওয়া যাবে, কিন্তু তা কোনোভাবেই কাজের বিনিময় হতে পারবে না।
২. কোরবানির পশুর হাড় বিক্রি নিষিদ্ধ:
অনেকেই কোরবানির পর হাড় জমিয়ে বিক্রি করেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ তথা হারাম। কোরবানির পশুর হাড়ও বিক্রি করা যাবে না। যদি কেউ ভুলবশত বা না বুঝে বিক্রি করে ফেলে, তবে বিক্রয়লব্ধ পুরো টাকাটাই গরিব-দুঃখীদের মাঝে সদকা (দান) করে দিতে হবে। (বাদায়িউস সানায়ি: ৪ / ২২৫)
৩. গৃহকর্মী বা কাজের লোকের বিধান:
ঘরের কাজের লোকদের কোরবানির গোশত দেওয়া যাবে, তবে তা কোনোভাবেই তাদের পারিশ্রমিক বা বেতনের অংশ হতে পারবে না। ঈদের এই আনন্দের সময়ে ঘরের অন্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরও স্বাভাবিকভাবে গোশত খাওয়ানো এবং উপহার হিসেবে দেওয়া যাবে। (আহকামুল কোরআন: ৩ / ২৩৭)
কোরবানি একটি পবিত্র ইবাদত। এর গোশত বা কোনো অংশ নিয়ে ব্যবসা করা বা কাউকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যেমন ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ, তেমনি ঈদের দিনে অসহায় মানুষের সংগৃহীত গোশত নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোটা চরম অমানবিকতা এবং হারাম কাজ।




