
বগুড়া শহরে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা। আধিপত্য বিস্তার, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, তুচ্ছ বিরোধ ও ব্যক্তিগত রেষারেষির জেরে প্রায়ই ঘটছে ছুরিকাঘাতের ঘটনা। এসব ঘটনায় আহত হওয়ার পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটছে।
গোয়েন্দা তথ্যের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহরে অন্তত ১৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব দলের নেতৃত্বে রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ জন চিহ্নিত ব্যক্তি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানের জানা গেছে, শহরের জলেশ্বরীতলা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, পুরোনো শিল্পকলা একাডেমি, মহিলা ক্লাব, মুক্তির ফুলবাড়ী, সেউজগাড়ী রেল কলোনি বধ্যভূমি, সুবিল ব্রিজ, ফুলবাড়ী নদীর ঘাট, উপশহর, কলোনি ও মালতীনগর স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় কিশোরদের ছোট ছোট দল আড্ডা বসায়। দামি মুঠোফোন ও বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে তারা এলাকায় ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে। এসব আড্ডা চলে রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত। তাদের বিরুদ্ধে ইভটিজিং, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও জমি দখলের মতো অপরাধে জড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।
সর্বশেষ শনিবার রাতে জলেশ্বরীতলা এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ জন কিশোরের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। রাত ৮টার দিকে এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন ও দোকানিরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্য, সামান্য বিষয় নিয়েই সেখানে কিশোরদের দলগুলোর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ ও মারামারি হয়।
চলতি বছরের ৩১ মে রাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন তরুণ ফটোগ্রাফার ফারহান তানভীর স্নিগ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, মদ্যপ অবস্থায় মোটরসাইকেলে আসা কিশোর গ্যাংয়ের তিন সদস্য তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ছুরিকাঘাত করেন। নিজ বাড়ির সামনেই ওই ঘটনা ঘটে। প্রাণে বেঁচে গেলেও হামলার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি।
তবে স্নিগ্ধের মতো বেঁচে ফিরতে পারেনি স্কুলশিক্ষার্থী সামিউল সিয়াম। চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল শহরের শাকপালা এলাকায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ছুরিকাঘাতে নিহত হয় সে।
দিনমজুর মায়ের একমাত্র সন্তান সামিউলের মৃত্যু এখনো মেনে নিতে পারেননি তার মা। ঘরে থাকা ছেলের বই-খাতা, স্কুলের পোশাক ও ব্যবহৃত জিনিসপত্রের মধ্যেই সন্তানের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন তিনি।
সামিউলের মা বলেন, ‘আমার ছেলেটাকে অন্যায়ভাবে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু বিচার চাই। যেন আর কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।’
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও। ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই শহরের বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে ৮১০টি বার্মিজ ও চায়নিজ চাকু উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। তবে এসব অভিযানের পরও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের ভয়ে এখন তটস্থ বগুড়াবাসী। সামান্য কথাকাটাকাটিতেই তারা ছুরি বের করে। পরিবারগুলোও আতঙ্কে আছে।’
জলেশ্বরীতলা এলাকার এক দোকানি বলেন, ‘এখানে প্রতিদিন কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা চলে। মারামারিও কমন বিষয়। মারামারি শুরু হলে অনেকে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়েন।’
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বগুড়ায় ৪৩০টির বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৯টি। একই সময়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ১০০ জন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব ঘটনার একটি বড় অংশের সঙ্গে কিশোর গ্যাং বা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত নয়—এমন শিক্ষার্থীদের বিষয়ে শিক্ষা অফিসে তথ্য পাঠানো দরকার। এতে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা কমানো সম্ভব হবে।
পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে। বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আতোয়ার রহমান বলেন, বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।




