
মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:
আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকদের অবদান, অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন বাংলাদেশের কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের বড় একটি অংশের বাস্তবতা ভিন্ন। কম বেতন, চাকরির অনিশ্চয়তা, অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার অভাব এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতায় অনেক শিক্ষকই পেশাগত হতাশায় ভুগছেন।
নিজের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমার অনেক বন্ধু কয়েক বছর আগে প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা নিয়ে মাদরাসার শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের অনেকে এখন পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় সেই চেষ্টাও অনেকের জন্য অসম্ভব হয়ে উঠেছে। যে চাকরিকে কেউ কেউ এক বছরের ‘এক্সপেরিমেন্ট’ হিসেবে শুরু করেছিলেন, সেটিই কারও কারও জীবনে সাত বছর পেরিয়ে গেছে।
শিক্ষকতাই যেন একমাত্র পথ
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একজন কওমি শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষকতা এখনো অন্যতম প্রধান পেশাগত পথ। কেউ ইমামতি করেন, কেউ ব্যবসায় যুক্ত হন, কেউবা লেখালেখি বা অন্যান্য কাজে আসেন। কিন্তু মাদরাসার একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে এসব পেশার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা সীমিত। ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষ করে অনেকটা অনন্যোপায় হয়েই শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন।
অথচ আরবি ও ইসলামি শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা, বেসিক আইসিটি, বাংলা, গণিত ও বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকলে তাদের সামনে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির দরজা খুলে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
১৫-২০ হাজার টাকায় ২৪ ঘণ্টার দায়িত্ব
কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি বেতন। অনেক প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের মাসিক পারিশ্রমিক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। কোথাও কোথাও তা নিয়মিত পরিশোধও হয় না। অথচ দায়িত্বের পরিধি অনেক ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টাকেন্দ্রিক।
জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে কওমি শিক্ষকদের আয় বাড়েনি। অন্যদিকে মাদরাসার সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর পরিমাণ বেড়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
নেই অভিন্ন নীতিমালা
দেশে কওমি মাদরাসার সংখ্যা ও পরিধি বাড়লেও সারাদেশে অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। কোন যোগ্যতায় শিক্ষক নিয়োগ হবে, ন্যূনতম বেতন কত হবে, ইনক্রিমেন্ট কীভাবে হবে, চাকরির নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ে কার্যকর ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতিমালার ঘাটতি রয়েছে।
এর ফলে অনেক সময় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান—উভয় পক্ষেরই স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ তৈরি হয়। একজন শিক্ষক দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও চাকরি হারালে অন্য প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন নাও হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কোনো প্রতিষ্ঠানে গুরুতর অভিযোগে বহিষ্কৃত কেউ পরিচয় গোপন করে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলে তা ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে নেই। শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের অধিকার-দায়িত্ব স্পষ্ট করা তাই জরুরি।
নেই চাকরির নিরাপত্তা, নেই ভবিষ্যৎ সুরক্ষা
কওমি শিক্ষকদের বড় একটি অংশ নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসেন। স্বল্প বেতনের চাকরিটির ওপর তাদের সংসার পুরোপুরি নির্ভরশীল। ফলে অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করতেও অনেকেই সাহস পান না।
অনেক প্রতিষ্ঠানে গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড কিংবা অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। একটি মাদরাসায় ১০ বছর কাজ করার পর চাকরি পরিবর্তন করলেও সেই অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে একজন মেধাবী তরুণ দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেও আর্থিক ও পেশাগত নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অথচ একজন শিক্ষকের আর্থিক স্বাধীনতা শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনের স্বস্তির জন্য নয়, পেশাগত স্বাধীনতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বদলে যাচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক
একসময় মাদরাসায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক ছিল গভীর আনুগত্য ও শ্রদ্ধাভিত্তিক। সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের ধরনও বদলেছে। প্রযুক্তি, সামাজিক পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের চিন্তাধারা মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও প্রভাব ফেলছে।
তবে এটিকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রজন্ম পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বরং বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সঙ্গে নতুন ধরনের সম্পর্ক তৈরি করাই সময়ের দাবি।
সংস্কার ছাড়া সংকট কাটবে না
কওমি মাদরাসার সমস্যা নিয়ে আলোচনা মানেই কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষককে দোষারোপ করা নয়। বরং বিশাল এই শিক্ষা ও কর্মপরিসরকে আরও সংগঠিত, আধুনিক ও টেকসই করার প্রয়োজনীয়তা সামনে আনা।
মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ন্যূনতম মানদণ্ড, শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা, বেতন কাঠামো, চাকরির নিরাপত্তা, অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন, অবসরকালীন সুবিধা এবং শিক্ষক-প্রতিষ্ঠানের অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণে একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কওমি শিক্ষার্থীদের শিক্ষকতার বাইরে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।
তবুও শিক্ষকতায় আসছেন তারা
এত সংকটের পরও অনেক তরুণ স্বপ্রণোদিত হয়ে মাদরাসা শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তারা জানেন, বেতন হয়তো খুব বেশি হবে না, চাকরির নিশ্চয়তাও সীমিত; তবু শিক্ষকতার প্রতি দায়বোধ ও ভালোবাসা থেকেই তারা এই পেশায় আসছেন।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই প্রশ্নটা শুধু—‘শিক্ষকরা কেমন আছেন?’—এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, যারা প্রজন্ম গড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন, তাদের জীবন ও পেশার নিরাপত্তা আমরা কতটা নিশ্চিত করতে পেরেছি?
কওমি মাদরাসার শিক্ষকরা শুধু একটি শ্রেণির শিক্ষক নন; তারা দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও মূল্যবোধ গঠনের সঙ্গে যুক্ত। তাদের সংকটের সমাধান তাই কেবল ব্যক্তিগত স্বস্তির বিষয় নয়, এটি শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।




