
রাজনীতিতে আসছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান? বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এমন আলোচনা এখন দেশের রাজনীতির অঙ্গনে। অবশ্য বাবা তারেক রহমানের সঙ্গে বা তার প্রতিনিধি হয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান এই আলোচনার জন্ম দিয়েছে আরও আগেই। গত বছর বাবার প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন জাইমা রহমান। এরপর প্রবাসী ভোট নিয়ে বিএনপির এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সর্বশেষ দাদি, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক জানাতে আসা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বাবার সঙ্গে ছিলেন জাইমা রহমান। এসব কারণেই অনেকে বলছেন, পারিবারিক ঐতিহ্য আর ধারাবাহিকতার জন্য জাইমা রহমানের রাজনীতিতে আসা সময়ের দাবি।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুর পর দলীয় নেতাকর্মীদের অনুরোধ বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন খালেদা জিয়া। হাল ধরেন দলের। শুরুর দিকে দলের সিনিয়র নেতাদের নিয়ে কাজ করলেও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর ছেলে তারেক রহমানকেও পাশে পান খালেদা। এরপর ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারেক রহমান। সে নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভের পর ইউনিয়ন প্রতিনিধি নিয়ে সম্মেলন করে প্রান্তিক মানুষের নেতা হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। এরপর এক-এগারোর প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়তে হয় তারেক রহমানকে। সঙ্গে নিয়ে যান মেয়ে জাইমা ও স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনেই কেটেছে জাইমার দিন। সেখানেই আইন পেশার সর্বোচ্চ ডিগ্রি বার এট ল অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়ে বাবার কাছ থেকে নেন নানা পাঠ। তার কিছু বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনাও হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এর মধ্যে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদল হলে তাদের দেশে ফেরার সম্ভাবনাও বাড়ে। এর মধ্যে খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় গত বছরের নভেম্বরে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন জাইমা রহমান। আর এ বছরও খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ২৫ ডিসেম্বর বাবার সঙ্গে দেশে ফেরেন তিনি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাবার পাশে থাকবেন তিনি।
ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নতুন কোনো ধারণা নয়। বাংলাদেশে ‘শেখ মুজিবর রহমান পরিবার’ কিংবা ‘জিয়া পরিবার’এই দুটি ধারা প্রমাণ করেছে, রাজনীতিতে পরিবারের যে কেউ যোগ্যতা বলে নেতৃত্ব দিতে পারেন। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার নাতনি এবং তারেক রহমানের একমাত্র মেয়ে হিসেবে জাইমা রহমানের রাজনীতির আলোচনায় আসা প্রায় অনিবার্যই ছিল। তবে জাইমার ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্যরকম। তিনি দীর্ঘদিন ছিলেন দৃশ্যপটের বাইরে না আন্দোলনে, না বক্তৃতায়, না দলীয় কোনো পদ-পদবি। তার নামটি এতদিন ছিল ‘সম্ভাবনার তালিকায়’। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি বলে দেয় শিগগিরই হয়তো রাজনীতিতে তার পদার্পণ ঘটবে।
গত বছরের ৭ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় তারেক রহমানকে। এমন পরিস্থিতিতে ওই বছর ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত ৭৩ তম ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি তিনি। সে সময় তার প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে যান জাইমা রহমান। ওই সফরের সময় জাইমা রহমান দক্ষিণ ক্যারোলিনার প্রাক্তন গভর্নর ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সাবেক নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রাক্তন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডেস্ট্রো এবং যুক্তরাষ্ট্রের উইমেনস ফেলোশিপ ফাউন্ডেশনের প্রধান রেবেকা ওয়াগনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ওই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তার এই অংশগ্রহণকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণও বলেও উল্লেখ করেছেন তারা।
তারা বলছেন, এটি কোনো দলীয় সম্মেলন বা রাষ্ট্রীয় সফর না হলেও বিশ্ব রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের এমন একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিনিধিত্ব করা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তারা বলছেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসাজনিত কারণে তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে মেয়েকে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। এতে একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির উপস্থিতি বজায় ছিল, অন্যদিকে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মকে ধীরে ধীরে পরিচিত করার কৌশলও স্পষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের ২৩ নভেম্বর ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিএনপির প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও অংশ নেন জাইমা।
গত ২৩ নভেম্বর প্রবাসীদের ভোট কার্যক্রম নিয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের উদ্যোগে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় লন্ডন থেকে প্রথমবারের মতো কোনো কার্যক্রম যুক্ত হন জাইমা রহমান। সভায় যুক্ত ছিলেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসাইন আলমগীর পাভেল, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকন প্রমুখ।




