
এস. গুলবাগী:
বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু নেতার নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব—যিনি শুধু রাষ্ট্রনায়কই নন, ছিলেন এক সাহসী সংগঠক, দূরদর্শী চিন্তাবিদ এবং জনমানুষের আপনজন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে ভ্রাতৃত্ব ও সংহতি জোরদারে তাঁর ভূমিকা আজও আলোচিত। সৌদি আরবের পবিত্র ভূমি মক্কার আরাফার ময়দানে তাঁর উদ্যোগে রোপিত নিমগাছ আজও “জিয়া ট্রি” নামে পরিচিত—যা তাঁর পরিবেশ সচেতনতা ও মানবিক দর্শনের প্রতীক হয়ে আছে।
তবে তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক। রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ দায়িত্বে থেকেও তিনি নিজেকে জনতার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। বরং ছদ্মবেশে গ্রামবাংলার পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, মানুষের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া নিজের চোখে দেখেছেন। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মহিষাবান গ্রামে তাঁর এমনই কিছু স্মৃতি আজও লোকমুখে জীবন্ত।
ঢাকা থেকে গোপনে রওনা হয়ে মাঝিড়া বন্দরে নেমে নিজের রেখে যাওয়া মোটরসাইকেল নিয়ে তিনি গ্রামের পথে ছুটে যেতেন। পথে চায়ের দোকানে বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, শুনতেন তাদের অভাব-অভিযোগ। কোনো প্রটোকল নয়, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—একজন রাষ্ট্রনায়ক কতটা সহজ-সরল হলে এভাবে মানুষের ভিড়ে মিশে যেতে পারেন, সেটিই ছিল তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য।
এমনই একদিন চায়ের আড্ডায় এলাকার জরুরি প্রয়োজন জানতে চাইলে এক প্রবীণ ব্যক্তি মজা করেই বলেছিলেন—“চিনির দামটা একটু কমিয়ে দেন।” রাষ্ট্রনায়ক হয়েও সাধারণ মানুষের এই সরল চাওয়াকে তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেছিলেন। আবার একবার পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কৌশলে নিজেকে আড়াল করে সেখান থেকে সরে যান—এইসব ছোট ছোট ঘটনাই তাঁর মানবিকতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক।
শুধু ব্যক্তিগত আচরণেই নয়, উন্নয়ন ভাবনাতেও তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ অভিযান—এসব উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তাঁর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে অসংখ্য তরুণ-যুবক স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল, গড়ে উঠেছিল সামাজিক সংযোগ ও উন্নয়নের নতুন ধারা।
আজ, বহু বছর পর, আবারও সেই খাল খনন কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু হওয়ার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সময়ের দাবি এখন শুধু খাল খননেই সীমাবদ্ধ না থেকে তাঁর প্রবর্তিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকেও জোরদার করা। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকটময় সময়ে পরিবেশ রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
একইসঙ্গে খাল-বিল, নদী-নালা দখলমুক্ত রাখা এবং বনভূমি রক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের সেই সবুজ, সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
স্মৃতির পাতায় তিনি শুধু একজন নেতা নন—একটি প্রেরণা, একটি দর্শন, একটি চলমান ইতিহাস।
লেখক: সাবেক সংসদ সদস্য, বগুড়া -৭ ।




