
ক্লাসরুমে বসে শিক্ষক ব্ল্যাকবোর্ডে কী লিখছেন, তা স্পষ্ট দেখতে পায় না বগুড়া জিলা স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আদিব (ছদ্মনাম)। ফলে প্রতিদিনই তাকে সহপাঠীর খাতা দেখে কিংবা বারবার জিজ্ঞেস করে পাঠ বুঝতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে দূরের লেখা পড়তে সমস্যা হলেও পরিবারের কাছে বিষয়টি গোপন রেখেছিল সে।
সম্প্রতি টেলিভিশন দেখার সময় একেবারে পর্দার সামনে গিয়ে বসতে দেখে তার মায়ের সন্দেহ হয়। কারণ জানতে চাইলে আদিব জানায়, দূর থেকে সে কিছুই স্পষ্ট দেখতে পায় না। পরে চক্ষু পরীক্ষা করালে ধরা পড়ে তার দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে।
শুধু আদিব নয়, বগুড়ার অসংখ্য শিশুর মধ্যেই একই সমস্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে দৃষ্টিস্বল্পতা বা মায়োপিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চোখের সমস্যা ধরা পড়লে পরিবারের পক্ষ থেকে মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে—এই আশঙ্কায় অনেক শিক্ষার্থী তাদের দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যার কথা অভিভাবকদের জানায় না। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা না হওয়ায় চোখের ক্ষতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে।
সম্প্রতি বগুড়া শহরের একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ সংকটের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ লক্ষ্য করে, বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে হোয়াইট বোর্ডের লেখা স্পষ্ট দেখতে না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে। এরপর প্লে গ্রুপ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর চোখের বিশেষ স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
স্ক্রিনিং শেষে পাওয়া ফলাফল রীতিমতো উদ্বেগজনক। মোট ১ হাজার ৫১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১৮ জনের চোখে গুরুতর দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা শনাক্ত হয়। অর্থাৎ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী দৃষ্টিস্বল্পতায় ভুগছে। পরে চক্ষু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী এসব শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় পাওয়ারের চশমা সরবরাহ করা হয়েছে।
চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলোতে খেলাধুলা না করা এবং নিয়মিত চোখ পরীক্ষা না করানোর কারণে শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া দ্রুত বাড়ছে। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ, খোলা পরিবেশে খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং বছরে অন্তত একবার চোখ পরীক্ষা করানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় আগামী প্রজন্মের একটি বড় অংশ দৃষ্টিজনিত সমস্যার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।এই সংস্করণটি জনকণ্ঠের বিশেষ প্রতিবেদনধর্মী উপস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানবিক গল্প, পরিসংখ্যান, উদ্বেগ ও জনস্বাস্থ্যগত গুরুত্বকে সামনে এনেছে।




