২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৬ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

দুষ্কৃতকারীদের গাছ বানিজ্যে মুক্তি নেই দশ গ্রামবাসীর, বছরের পর বছর ধরে হচ্ছে না রাস্তা পাঁকা

spot_img

একটি রাস্তা হাজারো নিরিহ মানুষের দুর্ভোগ। একটি রাস্তায় ইউক্যালিপ্টাস গাছ লাগিয়ে যেন মহাবিপাকেই পড়েছে এলাকাবাসী। তার মাঝে বর্ষা মৌসুম আসলেই রাস্তাটি হালচাষের উপযোগী হয়ে ওঠে।২০০৮ সালের পর আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাস্তাটি অবহেলায়। বিভিন্ন সময় জামায়াত শিবির নাম বলে রাস্তাটির পাকাকরণ করেনি জুলাই হত্যা মামলার আসামি দিনাজপুর ৬ আসনের সাবেক আওয়ামীলীগের এমপি শিবলী সাদিক।

দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ থানার ৬নং ভাদুরিয়া ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের শিবরামপুর, হরিণা-গুমড়া, কাশিয়ারাসহ প্রায় ১০ গ্রামের চলাচলের একমাত্র রাস্তা শিবরামপুর টু চাটশাল শহীদ আবু বক্কর সিদ্দিক সরক। রাস্তাটি নবাবগঞ্জ থানার শিবরামপুর গ্রাম থেকে ঘোড়াঘাট থানার চাটশাল ব্রিজ পর্যন্ত। ২০০৯ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসলে ১০০+ মানুষ কাঁচা রাস্তাটির দুই পার্শে দু’দফায় ইউক্যালিপ্টাস গাছ রোপন করে।

শিবরামপুর গ্রামের মোঃ রফিক সরকার (৪৮) গাছ রোপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি রাস্তার গাছ নিয়ে এলাকার সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি করেই চলেছে। তিনি গাছ বিষয়ে ইউএনও অফিসারের বিরুদ্ধেও মানহানি মামলা করেছেন। তিনি নাকি আওয়ামী সরকার থাকা অবস্থায় ক্ষমতা প্রয়োগ করে ২০ বছরের টেন্ডার নিয়েছে রাস্তাটির। এমন কথাও এলাকাবাসীর মুখে শোনা যায়।

মোঃ রফিক সরকার বিভিন্ন সময় নিজেকে বিভিন্ন পরিচয়ে বহন করে। কখনো তিনি সাংবাদিক আবার কখনো তিনি মানবাধিকার কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। রফিক ও তার বড় ছেলে মোঃ রিফাত (২২) গ্রাম ও এলাকার মানুষকে মামলা দিয়ে, মানুষকে বিভিন্ন ফাঁদে জরিয়ে, ভুয়া চাকরি দেওয়ার নামে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। রফিক ২০২১ সালে রাস্তার গাছগুলো গ্রামের যে মানুষগুলো গাছ লাগিয়েছিলো তাদের থেকে কিনে নেয়। পরবর্তীতে রাস্তা পাকাকরণের টেন্ডার আসলে রাস্তার গাছ কাটতে অনিহা দেখায় রফিক। গাছ কাঁটার উদ্যোগ নিলে ইউএনও সহ গ্রামের মানুষের উপর মামলা করে। যার ফলে বছরের পর বছর কাঁদা নরদমা হয়ে পড়ে আছে রাস্তাটি। টেন্ডার হয়েও হচ্ছে না পাকা।

শিবরামপুর গ্রামের বাসিন্দা মোঃ রুমন এ বিষয়ে জানান, গাছের জন্য রাস্তাটি পাকা হচ্ছে না। পাকা করণের জন্য ১২ ফিট চওড়া রাস্তা প্রয়োজন কিন্তু গাছ থাকার জন্য রাস্তাটি ১০ ফিটের কম চওড়া হয়ে আছে। সরক ও জনপদ বিভাগ থেকে সাড়ে ৩ কিমি রাস্তার টেন্ডার হয় ২০২২ সালে। বিভিন্ন সময় গাছ বিক্রির কথা উঠলেও রফিক জোর করে গাছ গুলো দখল করে রাখছে। রাস্তার পাশের জমিগুলোতে ধানচাষ হয়না এইসব গাছের জন্য। গাছ না কাটার জন্য রাস্তার টেন্ডার বাতিল হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আমরা বাসা থেকে বের হতে পারিনা। কোনো যানবাহন বর্ষায় এই রাস্তা দিয়ে চলেনা। আমাদের ৩ কিমি কাঁদা রাস্তা পায়ে হেটে পাকা রাস্তায় উঠতে হয়। আমরা দুষ্কৃতকারী রফিককে গ্রেফতার চাই এবং আমাদের এই গ্রামবাসীর কষ্টের লাঘব চাই।

২০০৯ সালে রাস্তায় মাটি কেটে ছিলো সেসময়কার ইউপি চেয়ারম্যান মোকছেদ আলী। তারপর থেকে ১৫ বছরে আর মাটি পরেনি এই রাস্তায়। ১ ফিট পুরত্বের মাটি উঠে গিয়ে রাস্তাটি এখন চাষকৃত জমির সাথে মিশে গেছে প্রায়। এলাকার ১০ গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম শিবরামপুর টু চাটশাল ব্রিজ রাস্তা। এই রাস্তা দিয়েই এলাকার মানুষ ভাদুরিয়া বাজার ও ইউনিয়নে জাতায়াত করেন। হাট ও বাজার করার জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মানুষ এই রাস্তা দিয়ে ভাদুরিয়া বাজারে যাতায়াত করেন। বর্ষার ভরা মৌসুমে কোনো ভ্যান, অটোরিকশা, সিএনজি সাহ কোনো গাড়ি রাস্তায় চলাচল করেনা। এমনকি মোটরবাইকও চালানো যায়না বর্ষা মৌসুমে। এমন দুর্ভোগের শেষ কোথায় জানা নাই এলাকাবাসীর। বৃষ্টি নামলেই এক হাটু পরিমাণ কাঁদা হয় রাস্তায়।

এমন দুর্ভোগের হাত থেকে রেহায় পেতে রবিবারে (০৮-০৯-২০২৪ ইং) মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে শিবরামপুর গ্রাম ও আসেপাশের এলাকাবাসী। তুলে ধরেন রাস্তা নিয়ে তাদের দীর্ঘ সময়ের কষ্টের কথা। দীর্ঘকাল রাস্তার এই বেহাল দসার পরেও এগিয়ে আসেনি চেয়ারম্যান, এমপি কিনবা আওয়ামী লীগের কোনো রাজনৈতিক নেতা। অবহেলিত জীবন যাপন করতেছে এলাকার ১০ গ্রামের মানুষ। কেউ অসুস্থ হয়ে পরলেও মিলেনা তাৎক্ষণিক কোনো চিকিৎসা সেবা। যানবাহনের অভাবে সঠিক সময়ে হাসপাতালে নিতে পারে না রুগীকে। মূমুর্ষূ রুগী হলে মহাবিপদে পরে গ্রামবাসী। আন্তঃসত্বা নারীদের নিয়ে আতঙ্কে থাকে পরিবার। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এই এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা। বর্ষা নামলেই রাস্তা যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা যেতে পারেনা স্কুল কলেজে। রাস্তা হয়ে যায় আঁকাবাকা সরু খারি কিনবা কাদাময় নদী। এমন দুর্দশা থেকে মুক্তি চায় এলাকাবাসী। সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর চাওয়া খুব দ্রুত বাতিলকৃত রাস্তার টেন্ডার আবার পুনরায় টেন্ডার করে অতি দ্রুত রাস্তাটি পাঁকা করা হোক।

বিভিন্ন সময় রাস্তা পাকা করণের দাবি নিয়ে এলাকাবাসী তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শিবলীর নিকট গেলে তিনি এই এলাকাকে জামায়াত-শিবিরের এলাকা বলে ফিরিয়ে দিতেন। ২০১৭ সালের দিকে এমপি শিবলী শিবরামপুর গ্রামের মানুষকে বর্ষাকালে পলিথিন পায়ে হাটতে বলেন। কতোটা দূর্নীতি আর অনিয়মের ভেতর দেশ চললে এমন অমানবিক কথা বলতে পারে তা এলাকাবাসীর জানা নাই।

জানা যায়, এই রাস্তার ১৮০০+ গাছ নিয়ে বিভিন্ন সময় চলেছে দুস্কৃতকারীদের গাছ বিক্রি করে টাকা আত্বসাৎ করার প্রতিযোগিতা। অনেকেই ক্ষমতা দেখিয়ে রাস্তার গাছ বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা লুফিয়ে নিয়েছেন। গাছের মালিক দাবি করে, করেছেন নিজের উন্নতি, করেছে গাড়ি বাড়িসহ অনেক কিছু। শিবরামপুর গ্রামের মোঃ আঃ রফিকুল ইসলাম (৪৮) পিতা- মোঃ আব্দুল মান্নান, ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার শিবরামপুর গ্রামের মোঃ কাউছারুল মন্ডল(৪৫) পিতা- আঃ রহিম মন্ডল ও তার ছোট ভাই সরোয়ার (৩৩) শিবরামপুর গ্রামের মোঃ আঃ হারুন সহ এলাকার আওয়ামীলীগের ও ছাত্র লীগের বিভিন্ন কর্মী গাছ বানিজ্যের সাথে জড়িত।

সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে গাছের মালিকানা প্রসঙ্গে নবাবগঞ্জ থানার ইনসার্চ অফিসার বরাবর একটি অভিযোগ পত্র দায়ের করেন শিবরামপুর গ্রামের মোঃ কাউছারুল মন্ডল। তিনি অভিযোগ পত্রে জানান, মোঃ রফিকুল ইসলাম (রফিক) দশ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার (১০,৫০০০/) টাকায় তার নিকট সব গাছ বিক্রি করেছেন। তিনি জানান, আমি ৫ কিস্তিতে টাকা পরিশোধ করে গাছের পূর্ণ মালিকানা নেই। কিন্তু রফিক বিভিন্ন তালবাহানা করে গাছ হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে এবং তার স্ত্রীকে বাদী করে আমার নামে মামলা করেছে এবং আমাকে হামলার হুমকি দিচ্ছে। দিনাজপুর মেজিস্ট্রেড অফিসে মামলাটি চলমান রয়েছে।

দুষ্কৃতকারীদের এমন ষড়যন্ত্র ও রাস্তার বেহাল দশা থেকে মুক্তি পেতে অত্র গ্রামের সকল নিপিড়ীত সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে গণহারে গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেন। এমন সময়ে দুষ্কৃত রফিক গ্রামবাসীকে হুমকি দেয় এবং থানায় ১২০+ জনগণের নামে মামলা করার চেষ্টা চালায়। গ্রামের মানুষ রফিক ও তার পরিবারকে সমাজ থেকে বয়কট ঘোষণা করেছে এবং রফিকের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। গ্রামবাসী যেকোনো মুল্যে রাস্তা সংস্কার ও পাকা চায়। তাদের দীর্ঘ সময়ের কষ্টের অবসান আয় শিবরামপুর গ্রামবাসী।

নতুন প্রজন্মের এই স্বাধীন বাংলাদেশে সকল অন্যায় ও দুর্নীতি নিপাত যাক। শান্তিতে স্বাধীনভাবে বসবাস করুক বাংলাদেশের সকল নাগরিক।

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ