
এস এ সবুজ:
বগুড়া জেলার কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ক্যানভাসে বগুড়া-৭ (গাবতলী–শাজাহানপুর) আসনটি দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম উত্তপ্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এতে শুধু দলীয় প্রার্থীদের অবস্থান নয়, ভোটারদের মনোভাবেও লক্ষণীয় প্রভাব পড়েছে।
ঐতিহ্যগতভাবে এ আসনে বিএনপির শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ আসন থেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল বেগম খালেদা জিয়ার। তাঁর অসুস্থতার কারণে বিকল্প হিসেবে গাবতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোরশেদ মিল্টন মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর আসনটিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে তীব্রতা পেয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে গোলাম রব্বানীকে। তিনি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারের পতনের পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সংগঠিত প্রস্তুতির কারণে জামায়াত এ আসনে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর ফলে বিএনপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক শাহীন বলেন, “এই আসনে জনগণের ভরসার নাম বিএনপি। খালেদা জিয়া থাকুন বা না থাকুন—বগুড়া-৭ আসনে বিএনপি ছাড়া অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই। ভোটাররা এখনো বিএনপিকেই বিকল্প হিসেবে দেখছেন।”
গণভোট বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আব্দুল্লাহীল ছোটন বলেন, বর্তমানে ভোটসংক্রান্ত সরাসরি কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় মাঠে প্রচার চালানো যাচ্ছে না। তবে জুলাই সনদের পক্ষে গণভোটের প্রচারণা অনলাইনে পরিচালনা করা হচ্ছে।
এদিকে খালেদা জিয়ার মৃত্যু জামায়াতের জন্য কোনো সুযোগ তৈরি করেছে কিনা—এ বিষয়ে বগুড়া-৭ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মাওলানা শহিদুল ইসলাম বলেন, “খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে আমাদের জন্য আলাদা কোনো সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। আমরা আগেই মাঠে সংগঠিত অবস্থানে ছিলাম। ধারাবাহিক সাংগঠনিক কার্যক্রমের কারণেই আজ ভালো অবস্থানে আছি।”গণভোট প্রসঙ্গে তিনি জানান, জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণভোট সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা নেই। সে কারণে তফসিল ঘোষণার আগেই লিফলেট বিতরণসহ জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
ভোটার মহিউস সাইয়েদ পাশা বলেন, “খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে যারা দলীয় রাজনীতির চেয়ে জিয়া পরিবারকে আবেগ দিয়ে সমর্থন করতেন, তাদের ভোটে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।” গণভোট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকার অনেক প্রবীণ মানুষ গণভোট কী—তা জানেন না।
আরেক ভোটার রবিউল ইসলাম বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন সবার আবেগের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি এ আসন থেকে নির্বাচন করলে অন্য কোনো প্রার্থীর জয়ের সুযোগ থাকত না। তাঁর ইন্তেকালের পর বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলকভাবে দুর্বল মনে হচ্ছে। এতে কিছু ভোট জামায়াতের দিকে যেতে পারে।” গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আরও ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন ছিল।
কৃষক বাছেদ আলী জানান, তিনি গণভোটের কথা শুনেছেন, তবে এর প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নেই। নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
সরেজমিনে গাবতলী–শাজাহানপুর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের গণভোট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলেও সাধারণ মানুষের আলোচনায় নির্বাচনই প্রধান, অন্য বিষয়গুলো তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। সচেতন মহলের মতে, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে জনগণের পর্যাপ্ত ধারণা না থাকলে জুলাই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
রাজনৈতিক কর্মী ও বিশ্লেষকদের ধারণা, বগুড়া-৭ আসনের আসন্ন নির্বাচন কেবল দুই দলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দলীয় অনিশ্চয়তা, নেতৃত্বের প্রভাব, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা এবং স্থানীয় বাস্তবতা—সব মিলিয়েই ভোটারদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।




